শুক্রবার

২৬ জুন, ২০২৬ ১২ আষাঢ়, ১৪৩৩

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৩৫

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬ ০৮:০২

শেয়ার

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৩৫
ছবি সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের এলাকায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ জনে পৌঁছেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও শত শত মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু মানুষ। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে এ প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর কারাকাস থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। ১৯০০ সালের পর এটিই দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, প্রায় ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্তত আটটি হাসপাতাল, ভেনেজুয়েলা রেড ক্রসের সদর দপ্তর এবং ফরাসি দূতাবাসের ভবন রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে প্রায় ৭০ হাজার পরিবার দুর্যোগের শিকার হয়েছে। রাজধানী কারাকাসের পাশের উপকূলীয় এ রাজ্যকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বিপর্যয় অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। এছাড়া অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কারাকাস বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

দফায় দফায় আফটারশকের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা শহরের বাসিন্দা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ জানান, তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে একটি সাততলা আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছে। উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে স্থানীয়রা নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন। সরকারি সহায়তা পর্যাপ্ত গতিতে পৌঁছাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এলাকার বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে কারাকাস-লা গুয়াইরা মহাসড়ক ব্যবহার করে উপকূলীয় অঞ্চলে পানি, খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছেন। ৬৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী পেড্রো পেরেজ বলেন, তিনি নিজের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুটিই হারিয়েছেন এবং বর্তমানে পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।

সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় ভূমিকম্পের সময় অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ বাসভবনে ছিলেন। কম্পন শুরু হলে আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেজান্দ্রা বলেন, পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি কারাবোবো রাজ্যের মোরন শহরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে বহু ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক এলাকার প্রায় ২০০ পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এলাকা ত্যাগের চেষ্টা করছে।

মোরনের বাসিন্দা দেনিস সেকেরা জানান, ভূমিকম্প শুরু হলে তার পাঁচ বছর বয়সী নাতনি ৭৯ বছর বয়সী দাদাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। পরিবারটি রাতটি খোলা জায়গায় কাটিয়েছে এবং এখন সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে।

ইউএসজিএস আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বিবেচনায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে পরিচালিত নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানভিত্তিক একটি ওয়েবসাইটে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা আসতে শুরু করেছে। হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাবে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে, যাতে ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা পাঠাতে কোনো বাধা না থাকে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারকারী দল পাঠাবে এবং কারাকাস বিমানবন্দর সচল করতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেবে। জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ চলছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বৃহৎ পরিসরের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে জাতিসংঘের ভেনেজুয়েলা মানবাধিকার মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত তেল শিল্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। দেশটিতে কার্যরত আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, তাদের তেল অবকাঠামো আপাতত নিরাপদ রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স, এবিসি নিউজ



banner close
banner close