সোমবার

২২ জুন, ২০২৬ ৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

দিল্লিতে আন্তঃরাজ্য শিশু পাচার চক্রের পর্দা ফাঁস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬ ০৭:৪১

শেয়ার

দিল্লিতে আন্তঃরাজ্য শিশু পাচার চক্রের পর্দা ফাঁস
ছবি সংগৃহীত

দিল্লিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নবজাতক কেনাবেচার এক চাঞ্চল্যকর আন্তঃরাজ্য চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। এই চক্রটি দরিদ্র পরিবারের শিশু সংগ্রহ বা চুরি করে এনে জাল নথিপত্রের মাধ্যমে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বিক্রি করত। এ ঘটনায় হাসপাতালের মালিক ও চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তদন্তের সূত্রপাত হয় দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগের ভিত্তিতে। একজন নারীকে নিয়মিত নতুন নতুন নবজাতক নিয়ে এলাকায় চলাফেরা করতে দেখে তিনি পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামে ওই নারীকে নজরদারিতে রাখে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে একজন নারী পুলিশ সদস্য ক্রেতা সেজে ওই চক্রের সাথে যোগাযোগ করেন। ৫ জুন অগ্রিম ২০ হাজার রুপি পরিশোধ করে শিশু হস্তান্তরের সময় কমলেশকে হাতেনাতে আটক করা হয়।

আটক কমলেশকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ তার সহযোগী শালু, ললিত, প্রতিভা ও বিপিনের সন্ধান পায়। পরবর্তীতে তাদের গ্রেপ্তার করে প্রায় ৩ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়। টানা অভিযানে এখন পর্যন্ত এক মাসের কম বয়সী পাঁচটি নবজাতককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, পশ্চিম দিল্লির রোহিণীর বেগমপুর এলাকায় অবস্থিত হীরা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল ছিল এই চক্রের মূল কেন্দ্র। হাসপাতালের মালিক ডাক্তার বিবেকী এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করতেন। পাচারকারীরা শিশুদের সংগ্রহ করে ওই হাসপাতালে নিয়ে আসত এবং বিক্রির আগ পর্যন্ত সেখানেই রাখা হতো। একই সঙ্গে শিশুদের বৈধতা দিতে ওই হাসপাতালেই তাদের জন্ম হয়েছে মর্মে জাল জন্মসনদ ও হাসপাতালের প্রয়োজনীয় নথি তৈরি করা হতো।

দিল্লি সেন্ট্রাল জেলার ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং জানান, শিশু বিক্রির যাবতীয় লেনদেন এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হতো এবং ডাক্তার বিবেকী ক্রেতা ও পাচারকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতা করতেন। পুলিশি অভিযানে পরবর্তীতে গুজরাটের সবরকান্থা থেকে সাবাভাই গামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজস্থানের দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে শিশু সংগ্রহ করে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিতেন।

পাচার হওয়া শিশুদের দাম নির্ধারিত হতো তাদের লিঙ্গভেদে। সাধারণত কন্যা শিশু ১ লাখ রুপিতে সংগ্রহ করে ৩ থেকে ৪ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। অন্যদিকে, অধিক চাহিদা থাকায় ছেলে শিশু ২ লাখ রুপিতে কিনে ৬ থেকে ৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করত চক্রটি। তদন্তে একটি জালিয়াতির ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে দুটি ভিন্ন স্থান থেকে আনা শিশুকে যমজ ভাই-বোন পরিচয় দিয়ে এক দম্পতির কাছে ৯ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হয়েছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, গত এক বছরে এই চক্রটি অন্তত ৩০টি নবজাতক বিক্রি করেছে। এই ঘটনায় হরিয়ানার পানিপথ এবং মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে কয়েকজন ক্রেতাকেও শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুদের বর্তমানে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে এবং তাদের প্রকৃত অভিভাবকদের সন্ধান করা হচ্ছে।

ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং এই চক্র ভাঙার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সাব-ইন্সপেক্টর প্রগতি, যামিনী ও হেড কনস্টেবল সুষমার প্রশংসা করেছেন। পুলিশ আরও জানায়, শিশুদের প্রকৃত অভিভাবকরা যদি স্বেচ্ছায় সন্তান বিক্রি করে থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে যারা এসব শিশু কিনেছেন, তাদেরও মামলার আওতাভুক্ত করা হতে পারে।



banner close
banner close