ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর, পাল্টা জবাবে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট 'হরমুজ প্রণালী'-তে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত এক চরম ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এই নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
আমেরিকার আকস্মিক বিমান হামলা
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, কমান্ডার-ইন-চীফের সরাসরি নির্দেশে বুধবার মার্কিন বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী ও মেরিন ক্রপস যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানের সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে এই ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালানো হয়, যা আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন সেনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ, জাহাজে আঘাত
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ইরানের সামরিক কমান্ড জানায়, এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ইতোমধ্যে অবৈধভাবে প্রণালীটি পার হওয়ার চেষ্টা করায় দুটি জাহাজে আঘাত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি নৌ কর্তৃপক্ষ।
মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আঘাত ও বাহরাইনে সাইরেন
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করে, মার্কিন হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তারা কুয়েতের ‘আলি আল-সালেম’ ও ‘আহমেদ আল-জাবের’ এবং বাহরাইনের ‘শেখ ঈসা’ বিমান ঘাঁটাসহ মোট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর বাহরাইনজুড়ে জরুরি বিমান হামলার সতর্কবার্তা বা সাইরেন বাজানো হয়। বাহরাইন সরকার দেশটির নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত আলটিমেটাম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "ইরানি নেতাদের অনুরোধে সাময়িকভাবে বোমা হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে ইরান যদি দ্রুত আমেরিকার দেওয়া শর্তে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর না করে, তবে পরবর্তী দিন থেকে আবারও স্মরণকালের ভয়াবহতম বোমা হামলা শুরু করা হবে।" ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানি কর্মকর্তারা নিজেই তাঁর সাথে যোগাযোগ করে বোমাবর্ষণ বন্ধের অনুরোধ জানান। যদিও ইরান এই ধরণের যোগাযোগের দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দেন এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধের ঘোষণা দেন।
অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব
দুই পরাশক্তির মুখোমুখি অবস্থানের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বুধবার (১০জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ২ ডলার বেড়ে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ইউএস ক্রুড উভয়ের দামই ২ শতাংশের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৯৪ ও ৯০ ডলার পার হয়ে গেছে। অন্যদিকে, এই যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে বড় পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই, দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি এবং অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজার সূচক লেনদেনের শুরুতেই বড় ধরনের পতনের সম্মুখীন হয়। যা পরবর্তীতে সামান্য পুনরুদ্ধার হলেও বাজার এখনো চরম অস্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করেন, দুই পক্ষ যদি এখনই শান্ত না হয়, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। সূত্র: এনডিটিভি
আরও পড়ুন:








