ইরানের ভূগর্ভস্থ মিসাইল ঘাঁটিগুলো গড়িয়ে দিতে ভয়াবহ গোলাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। তবে খুব দ্রুত ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণ করে সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছে তেহরান।
এতে বোঝা যাচ্ছে আকাশপথ থেকে বোমা হামলার মাধ্যমে সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র এবং মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান অত্যন্ত দ্রুত ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক পুনরায় সচল করে তুলছে। তেহরানের এই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা পেন্টাগন এবং পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরান দ্রুতই ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ মেরামত করতে সক্ষম হয়েছে।
যেকোনো সময় ইসরায়েল এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আরো বেশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে প্রস্তুত, যা মার্কিন বোমাবর্ষণ কৌশলের সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার বিমান হামলায় ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’র রাস্তা ও সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংসে খালি ইরানের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়েছিল বলে যোগ করেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে সিএনএনের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যায়, ইরান কীভাবে ব্যয়বহুল অভিযান মোকাবিলায় বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে—যা থেকে বোঝা যায়, শুধু সুড়ঙ্গের প্রবেশপথকে লক্ষ্যবস্তু করে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব নয়, বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।,
এদিকে তৃতীয় দফায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চরছে।
যুদ্ধবিরতিতে উভয় দেশ একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে কিছু বিষয়ে একমত হলেও পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস লাগবে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আবার শুরু হলে ক্ষেপনাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ থাকলেও, যতক্ষণ তেহরানের কাছে কর্মী থাকবে। ততক্ষণ ইরান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থানে আছে। তাদের কাছে এখনো যে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ রয়েছে। যা দিয়ে উৎক্ষেপকগুলোকে সজ্জিত করতে কোন বেক পেতে হবে না।
উল্লেখ, স্যাম লেয়ার, ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরিতে অবস্থিত জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষণা সহযোগী হিসেবেও কাজ করেন।
যুদ্ধ চলাকালীন ইরান অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো খননের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায়শই খননকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোতে হামলা চালায়। এতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ রাখলেও হার অনেকাংশে কমে এসেছিল।
সিএনএনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ৬৯টি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথের মধ্যে ৫০টি বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে পরিষ্কার করে ফেলেছে ইরান।
অন্যান্য ঘাঁটিগুলোর প্রবেশ পথও মেরামত সম্পূর্ণ করেছে তেহরান। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, বোমায় তৈরি হওয়া গর্তগুলোর প্রায় সব ভরাট করা হয়েছে। দুটি স্থানের রাস্তা পাকাকরনের কাজও শেষ।
এদিকে যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর সাফল্যকে তুলে ধরেন স্যাম লেয়ার। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন করাই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকে। তবে সাময়িক সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বড় ব্যর্থতা ডেকে আনে।’
সিএনএনের অনুসন্ধানের বিষয়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে, বরং পূর্বের একটি বিবৃতি পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রেসিডেন্টের আদেশে তারা যেকোন কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে।
ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির নেটওয়ার্ক ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মাণ শুরু করেছিল। যা ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপকগুলোকে যথেষ্ট সুরক্ষা দেয়। এই স্থাপনাগুলোর গভীরতা—যার কয়েকটি শত শত মিটার পাথরের নিচে অবস্থিত। এতে ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা সীমিত করে দেয়।
গেল ৮ এপ্রিল থেকে ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতির শুরু হয়। এ সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ইরানের বেশির ভাগ ক্ষেপনাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তার পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা তেহরানের নেই। কিন্তু যুদ্ধবিরতির সাত সপ্তাহের মত সময়ে ইরান ৯০ শতাংশ ক্ষেপনাস্ত্র ঘাঁটির সচল করে তেহরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দৃঢ়তাকেই প্রমাণ করেছে।
ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থানগুলোতে এখনো প্রায় ১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন বিমান হামলাগুলো সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ও সংযোগকারী রাস্তাগুলো ধ্বংস করে সাময়িকভাবে ইরানি বাহিনীকে ‘অবরুদ্ধ’ করতে পেরেছিল। তবে এই কৌশল স্থায়ীভাবে ইরানের শক্তিমত্তা ধ্বংস করতে পারেনি। যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে ইরান অতি সাধারণ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলারের বোমাবর্ষণ পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে।
ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার পুরোপুরি ধ্বংস করতে সক্ষম বিশেষায়িত ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমার সংখ্যা মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সীমিত। দীর্ঘস্থায়ী অভিযানে এই ধরনের দামি ও উন্নত সমরাস্ত্রের ঘাটতি মার্কিন বিমান হামলার কার্যকারিতাকে সীমিত করে দিয়েছে।,
আরও পড়ুন:








