ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হলে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে ফিরে যেতে ভিড় করছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সাত সকাল থেকেই এই সীমান্তে মানুষের ঢল নামছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দেন, রাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের আর থাকতে দেওয়া হবে না এবং তাদের ফেরত পাঠানো হবে। এই ঘোষণার পরপরই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানান, যারা অবৈধপথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, তারা স্বেচ্ছায় ফিরে গেলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুর গাজি জানান, শুরুতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন আসছিলেন। কিন্তু তিন দিন ধরে এই সংখ্যা কয়েকশোতে পৌঁছেছে। হাকিমপুর উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার অধীনে। বিএসএফের চেকপোস্ট পেরিয়ে তারালি গ্রামের পাশ দিয়ে সোনাই নদী পার হলেই বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা।
সীমান্তে পৌঁছানো ব্যক্তিদের প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ঘরে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। এরপর পুলিশ পরিবারপ্রতি ডেকে এনে বাংলাদেশের পরিচয়পত্র যাচাই, নাম ও স্থায়ী ঠিকানা লিপিবদ্ধ এবং ছবি সংগ্রহ করছে। হাসানুর গাজি আরও জানান, চেকপোস্টে নথি যাচাই ও বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বিএসএফ তাদের চার কিলোমিটার দূরে আমোদিয়া পদব্রজ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পার করে দিচ্ছে। কোনো দিন দিনের বেলায়, কোনো দিন রাতেও এই প্রক্রিয়া চলছে। নথি যাচাইয়ের পর যাদের সেদিন পার করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের স্বরূপনগর থানা এলাকায় স্থাপিত হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে।
সীমান্তে অপেক্ষারত বেশ কয়েকজন জানান, তারা যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে দুই থেকে ছয় বছর আগে অবৈধপথে ভারতে গিয়েছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে বসবাস ও কাজকর্ম করছিলেন।
কলকাতার দমদম বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী বাচ্চু মুন্সি জানান, তিনি প্রায় ৩৮ বছর আগে শিশু বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভারতে চলে যান। সেখানেই বিয়ে করেছেন, সন্তান-সন্ততি হয়েছে। তিনি আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং ভোটার পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছিলেন এবং ২০২৪ সালে ভারতের নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিলেন। তবে ২০২৬ সালের সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রণয়নে পরিচালিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় তার পরিবারের নাম বাদ পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফা শাওজি জানান, সীমান্তে আসা অনেকের কাছেই ভারতের বিভিন্ন পরিচয়পত্র রয়েছে, এমনকি কারো কারো কাছে ভোটার পরিচয়পত্রও পাওয়া গেছে।
যশোরের বাসিন্দা বলে দাবিকারী নাজমা জানান, বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলাদেশি পরিচয় সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় ফেরার সুযোগ পেয়ে তিনি দেশে ফিরে যাচ্ছেন। সাতক্ষীরার বাসিন্দা বলে দাবি করা রাইসা পারভিন জানান, এসআইআর চলাকালীন সময়েই তার বাবা-মা বাংলাদেশে ফিরে গেছেন। আখতারুল মোড়ল নামের আরেকজন জানান, পুলিশের চাপ এবং বাড়িওয়ালাদের বাধার মুখে টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। শাহিন আলম মোল্লা জানান, তিনি আর অবৈধপথে ভারতে ফিরবেন না, ফিরলে পাসপোর্ট নিয়ে বৈধভাবেই যাবেন।
সীমান্তে চলমান এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন বা বিএসএফের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আরও পড়ুন:








