কলকাতার রেড রোডে ঈদের ঐতিহ্যবাহী জামাত এবার অনুষ্ঠিত না হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ঈদুল আজহার আবহে নেমে এসেছে এক ধরনের বিষণ্নতা। বহু দশকের পরিচিত সেই চিত্র বদলে গিয়ে এবার ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিগেড ময়দানে। সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত জামাতে ইমামতি করেন ক্বারী ফজলুর রহমান। তবে উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম, উৎসবের আমেজও ছিল অনেকটাই অনুপস্থিত।
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার রেড রোডে ঈদের জামাত শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ব্রিটিশ আমলে খিলাফত কমিটির উদ্যোগে সেখানে জামাত শুরু হয়। পরে ব্রিটিশ সরকার রেড রোড নির্মাণ করলেও নামাজের ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ করেনি। স্বাধীনতার পরও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু এবার সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই পরিবর্তনের আলোচনায় উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, শুভেন্দু অধিকারী–ঘনিষ্ঠ বিজেপি মহলের চাপের কারণেই রেড রোডে জামাতের অনুমতি মেলেনি। যদিও এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।
এই প্রসঙ্গে কলকাতার বহু প্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তির ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নবাব আলীবর্দী খাঁ–এর সময়কার বিশাল সম্পত্তি ওয়াকফের ইতিহাস তুলে ধরে বলা হচ্ছে, কলকাতার বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকা একসময় ওয়াকফ সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলেও এসব সম্পত্তির ভাড়া পরিশোধের রীতি চালু ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়।
এদিকে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি বর্তমানে বেদখল ও অব্যবস্থাপনার শিকার বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাচার কমিটি–র সুপারিশের কথাও সামনে এসেছে। মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হলেও, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ইতিহাসের আরেকটি দিকও স্মরণ করা হচ্ছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নানা উদাহরণ রয়েছে। মোগল আমলে সম্রাট জাহাঙ্গীর–এর পক্ষ থেকে কালীঘাট মন্দিরের জন্য জমি দানের প্রসঙ্গ কিংবা পার্ক সার্কাস এলাকায় শিবমন্দির নির্মাণে মুসলিমদের ভূমিকার কথাও আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে এবারের ঈদুল আজহা ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে যেন বেশি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, ইতিহাস ও বঞ্চনার এক প্রতীকী প্রতিচ্ছবি।
আরও পড়ুন:








