বুধবার

৬ মে, ২০২৬ ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

আনন্দবাজারের বিশ্লেষণ: ৮ কারণে চাপে মমতার তৃণমূল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ মে, ২০২৬ ১০:০৮

শেয়ার

আনন্দবাজারের বিশ্লেষণ: ৮ কারণে চাপে মমতার তৃণমূল
ছবি সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকা-এর এক বিশ্লেষণে দলটির দুর্বলতার পেছনে আটটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের শাসনজনিত জনঅসন্তোষ, দুর্নীতির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাসসহ বিভিন্ন বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বা সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেট কার্যক্রম, স্থানীয় নেতাদের প্রভাব বিস্তার, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ এই অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি সংশোধনের সুযোগ থাকলেও তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত এসেছে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে। চিটফান্ড ও নারদ কাণ্ডের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, পুর নিয়োগ, রেশন বণ্টনসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এসব ঘটনায় একাধিক মন্ত্রী, বিধায়ক ও নেতা গ্রেপ্তার হওয়ায় জনমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া, যা এসআইআর নামে পরিচিত, সেটিও তৃণমূলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ভুয়া, মৃত বা একাধিক স্থানে নিবন্ধিত ভোটারদের নাম বাদ পড়ায় পূর্বের মতো ভোট ব্যবস্থাপনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দলটির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের ওপরও প্রভাব পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর প্রচারে এই ইস্যুটি গুরুত্ব পায় এবং তা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের একাংশের মনোভাবেও প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি সহিংস ঘটনার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও জনমনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তৃণমূলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা, বিচারবিভাগের হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক রদবদলের ফলে সরকারের সরাসরি প্রভাব কমে যায়। এতে নির্বাচনী সময়ে পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর দলের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে।

নির্বাচনকালে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং কঠোর নজরদারির ফলে সহিংসতা কমে গিয়ে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এতে বিরোধী দলগুলোর প্রচার ও ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়লেও শাসক দলের প্রচলিত সুবিধা সীমিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে কম ধাপে ভোটগ্রহণ এবং উচ্চ ভোটার উপস্থিতিও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া তৃণমূলের পরামর্শক সংস্থা I-PAC-সংক্রান্ত সংকটকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচনের আগে সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তদন্তের কারণে দল সাংগঠনিকভাবে চাপে পড়ে। দলটির অভ্যন্তরে এই সংস্থার ওপর অতিনির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তবে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব কারণ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। তৃণমূলের নেতাদের একাংশ মনে করেন, উন্নয়নমূলক কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প এবং জনসংযোগ কার্যক্রম এখনও দলের শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উল্লিখিত কারণগুলো কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী মাঠের চূড়ান্ত ফলাফল এবং ভোটারদের বাস্তব সিদ্ধান্তের ওপর।



banner close
banner close