সোমবার

৪ মে, ২০২৬ ২১ বৈশাখ, ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফল: মুসলিম ভোট, এসআইআর ও কৌশলগত লড়াইয়ে মমতার বড় ধাক্কা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ মে, ২০২৬ ১৯:৩৮

শেয়ার

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফল: মুসলিম ভোট, এসআইআর ও কৌশলগত লড়াইয়ে মমতার বড় ধাক্কা
ছবি সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এগিয়ে আছে ৮৪টিতে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮ আসন আগেই অতিক্রম করেছে বিজেপি, ফলে দীর্ঘ ১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গ-এ ক্ষমতার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের ফল নির্ধারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে—বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত আসন, ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) এবং আঞ্চলিক ভোটব্যাংকের পরিবর্তন।

প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার দীর্ঘদিন ধরে টিএমসির শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও এবার সেই জায়গায় ধস নেমেছে। ৫৪টি মুসলিম অধ্যুষিত আসনের মধ্যে টিএমসি ২০২১ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন হারিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে, যা সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।

ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সংশোধনের প্রভাব পড়েছে এমন ৯৪টি আসনে টিএমসি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, যেখানে বিজেপি উল্টো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে এগিয়ে রয়েছে।

মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটেও বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই ভোটব্যাংক আগের মতোই বিজেপির দিকেই রয়েছে, যা তাদের আসন ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।

টিএমসির ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতেও এবার ভাঙন দেখা গেছে। যেখানে অতীতে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিল দলটি, সেই আসনগুলোর অনেকগুলোতেই এবার পিছিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ‘বেলওয়েদার’ হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতেও বিজেপি এগিয়ে রয়েছে, যা সামগ্রিক ফলাফলের দিক নির্দেশ করে।

রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকেও বিজেপি এগিয়ে ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এক সময় টিএমসির ঘনিষ্ঠ নেতা শুভেন্দু অধিকারী-কে গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী করে দলটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিরুদ্ধে। এতে মমতাকে নিজের আসন রক্ষায় বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে, ফলে রাজ্যজুড়ে প্রচারণায় কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়।

নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। অতীতে টিএমসির পক্ষে থাকা এই ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে বিজেপি নারীর নিরাপত্তা ইস্যুকে জোরালোভাবে সামনে আনে। বিশেষ করে আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হয় এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও নারীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধার কথা বলা হয়।

এছাড়া সাংস্কৃতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও পাল্টা কৌশল নেয় বিজেপি। ‘বহিরাগত’ ইস্যুর জবাবে দলটি বাঙালি সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের প্রতি সমর্থন দেখানোর চেষ্টা করে। নরেন্দ্র মোদি-র পশ্চিমবঙ্গ সফর, ঐতিহ্যবাহী মন্দির পরিদর্শন এবং স্থানীয় খাবার গ্রহণের ঘটনাগুলো ভোটারদের কাছে প্রতীকী বার্তা হিসেবে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে, মুসলিম ভোটে ভাঙন, এসআইআর-এর প্রভাব, কৌশলগত প্রার্থী নির্বাচন, নারী ভোটে পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক বার্তার সমন্বয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবারের নির্বাচনের ফলাফল।



banner close
banner close