বৃহস্পতিবার

৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩

এক মাসে ভারতে মুসলিমদের ওপর ৬৮ হামলা, শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১৯:৫৩

শেয়ার

এক মাসে ভারতে মুসলিমদের ওপর ৬৮ হামলা, শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ
ছবি সংগৃহীত

ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই দেশজুড়ে মুসলিমদের লক্ষ্য করে অন্তত ৬৮টি ঘৃণ্য অপরাধ বা 'হেট ক্রাইম'-এর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এই সহিংসতার তালিকায় বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, যেখানে মোট ঘটনার প্রায় অর্ধেক সংঘটিত হয়েছে। 'মুসলিম মিরর মান্থলি হেট ক্রাইম ডাটাবেস'-এর এই প্রতিবেদনটি ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।,

তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ৬৮টি ঘটনার মধ্যে উত্তরপ্রদেশ একাই ৩০টি ঘটনার সাক্ষী। শতাংশের হিসেবে এটি মোট অপরাধের ৪৪.১%। পরিসংখ্যানে উত্তরপ্রদেশকে ‘অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ তথা লাল জোনে রাখা হয়েছে।,

অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে মহারাষ্ট্রে ৬টি, হরিয়ানায় ৫টি এবং রাজধানী দিল্লিতে ৫টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ৩টি করে ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম, বিহার ও মেঘালয়েও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। তবে দক্ষিণ ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু এবং উত্তর ভারতের পাঞ্জাবের মতো ১৪টি রাজ্যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।,

নিপীড়নের ধরণ: শারীরিক আক্রমণ ও সামাজিক লাঞ্ছনা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতার ধরণগুলো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং সুপরিকল্পিত। সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ভাঙচুর, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং মুসলিম পরিচয়ের কারণে অপমান ও ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা, যার সংখ্যা ১৫টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪টি ঘটনা ছিল সরাসরি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, যেখানে বিশেষভাবে মুসলিমদের টার্গেট করা হয়েছে।,

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অপরাধের মধ্যে রয়েছে-১১টি ক্ষেত্রে মুসলিমরা সামাজিক বা সরকারি স্তরে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, ৭টি ঘটনায় মুসলিম পরিবার বা ব্যক্তিদের সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে, ৬টি ঘটনা ঘটেছে মাংস ও গরু সংক্রান্ত বিতর্ককে কেন্দ্র করে, ৫টি ক্ষেত্রে উন্মত্ত জনতা কর্তৃক মুসলিমদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার খবর পাওয়া গেছে এবং ৩টি ঘটনায় ঘরবাড়ি বা স্থাপনা উচ্ছেদে বুলডোজার ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক যোগসূত্র ও আইন-শৃঙ্খলার ভূমিকা

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ২০১৪ সালে বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই ধরণের ঘৃণ্য অপরাধের হার কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৫% ঘটনার সাথে সরকারি দল বা তাদের সহযোগী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।,

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মুসলিমরা যখন সাহায্যের জন্য পুলিশের দ্বারস্থ হন, তখন তাদের প্রতি চরম উদাসীনতা বা বিরূপ মনোভাব দেখানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পেয়ে আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠছে।,

মুসলিম মিররের এই বিশেষ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম জনসংখ্যার বিরুদ্ধে চলা প্রতিটি অপরাধের একটি সুশৃঙ্খল এবং বিশ্লেষণধর্মী ডাটাবেস তৈরি করা। এই তথ্যভাণ্ডারে ঘটনার তারিখ, স্থান, অপরাধের মোটিভ, ভুক্তভোগী ও অপরাধীর পরিচয় এবং আইনি পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

এই তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক এবং গবেষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংখ্যাগুলো কেবল রিপোর্ট করা ঘটনার ভিত্তিতে; প্রকৃত চিত্র এর চেয়েও অনেক বেশি ব্যাপক হতে পারে।

মার্চ ২০২৬-এর এই পরিসংখ্যান ভারতের সামাজিক সম্প্রীতির ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী ছায়া ফেলেছে। শারীরিক সহিংসতা (৪৩%) এবং বৈষম্যমূলক আচরণ (১৬.২%) প্রমাণ করে যে, সমাজে মুসলিমদের প্রতি পদ্ধতিগত শত্রুতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, যদি দ্রুত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই ঘৃণা ও সহিংসতার আগুন ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।,



banner close
banner close