ভারতের বিহারের কিষাণগঞ্জ জেলার এক আলেমকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৬ এপ্রিল উত্তর প্রদেশের বেরেলি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম মাওলানা তৌসিফ রাজা মাজহারী। তিনি ঠাকুরগঞ্জের বাখোতলি গ্রামের বাসিন্দা এবং সিওয়ানের একটি মাদরাসার শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম ছিলেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে 'দুর্ঘটনা' বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও নিহতের পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তৌসিফ রাজাকে পরিকল্পিতভাবে মারধর করে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে।
ভিডিও কলে স্বামীর ওপর হামলা দেখলেন স্ত্রী
নিহত তৌসিফ রাজার স্ত্রী তাবাসসুম খাতুন সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। 'দ্য অবজারভার পোস্ট'কে তিনি জানান, ২৬ এপ্রিল রাতে ট্রেনের ভেতরে থাকা অবস্থায় তৌসিফ তাকে ফোন করে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ভীত ছিলেন এবং জানান যে কিছু লোক তাকে মারধর করছে।
তাবাসসুম বলেন, “আমার স্বামী বারবার সাহায্য চাচ্ছিলেন, কিন্তু ট্রেনের কোনো যাত্রী তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। তারা তাকে 'চোর' বলে অপবাদ দিচ্ছিল। তিনি ভিডিও কলে তার ব্যাগ ও কিতাব (বই) দেখিয়ে বলছিলেন— আমি চোর নই, আমি মাদরাসার শিক্ষক। আমিও ফোনের ওপাশ থেকে চিৎকার করে মানুষকে সাহায্য করতে বলছিলাম, কিন্তু কেউ শোনেনি।”
তিনি আরও জানান, তিনি ভিডিও কলেই দেখেছিলেন কীভাবে লোকজন তার স্বামীর কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারছে। তাবাসসুমের অভিযোগ, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয় বরং গভীর কোনো ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, “তার মুখে দাড়ি এবং মাথায় টুপি ছিল। সম্ভবত তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই তাকে টার্গেট করা হয়েছে।”
দুর্ঘটনার দাবি প্রত্যাখ্যান
পরিবারের দাবি, মরদেহের অবস্থা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটি দুর্ঘটনা নয়। তাবাসসুম বলেন, “যদি তিনি চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে যেতেন, তবে শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। কিন্তু তার শরীর অক্ষত ছিল এবং সারা শরীরে মারধরের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।” সারারাত ফোনে না পাওয়ার পর পরদিন সকালে এক পুলিশ কর্মকর্তা ফোন ধরেন এবং জানান যে রেললাইনের পাশে তার মালামাল ও মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আতঙ্ক
এই ঘটনার পর দিল্লির মতো বড় শহরগুলোতে কাজ করতে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা তওয়াঙ্গার হোসেন বাঘী বলেন, “খবরটি শুনে আমরা স্তব্ধ। এখন পর্যন্ত কোনো নেতা বা বড় মিডিয়া এখানে আসেনি। মানুষ এতটাই আতঙ্কিত যে অনেকে ট্রেনের টিকিট বাতিল করছে। তারা ভয় পাচ্ছে যে দাড়ি-টুপি আর নামের কারণে তাদেরও এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হতে পারে।”
তিনি এই ঘটনাকে আখলাক বা পেহলু খানের মতো গণপিটুনির ঘটনার সাথে তুলনা করে বলেন, “এটি দুর্ঘটনা নয়, এটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা যদি আজ রুখে না দাঁড়াই, তবে কাল আমাদের যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে।”
ষড়যন্ত্রের অভিযোগ চাচার
তৌসিফ রাজার চাচাও দুর্ঘটনার তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানান, হামলাকারীরা কৌশলে সাধারণ যাত্রীদের উত্তেজিত করতে তাকে 'চোর' বলে অপবাদ দিয়েছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি অপরাধ নির্মূল হয়ে থাকে, তবে প্রকাশ্য দিবালোকে ট্রেনের ভেতর এমন হামলাকারীরা আসে কোত্থেকে?”
নিহত তৌসিফ রাজার পরিবার এখন আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা উত্তর প্রদেশ সরকার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন:








