মঙ্গলবার

২৩ জুন, ২০২৬ ৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে ২০ বিলিয়ন ডলার নগদ পাচ্ছে ইরান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:৫৪

শেয়ার

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে ২০ বিলিয়ন ডলার নগদ পাচ্ছে ইরান
ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি ‘নির্দিষ্ট শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়ে আলোচনা চলছে। অত্যন্ত গোপনীয় এই চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি)। ডলার ফেরত পেতে পারে বলে জানা গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এবং এই আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র অ্যাক্সিওসকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও চলতি সপ্তাহে দুই দেশের আলোচনার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। এখন এই শর্তাবলিতে কোনো চুক্তি হলে, তা চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কট্টরপন্থী রিপাবলিকান এবং ইসরায়েল এই চুক্তির কড়া সমালোচনা করতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল জানিয়েছেন, আগামী রোববার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে এবং মিসর ও তুরস্কের সহায়তায় এই বৈঠকের মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।

সমঝোতা চুক্তির মূল ভিত্তি

এবারের আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ইরানের কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কেড়ে নেওয়া। বিশেষ করে ৪৫০ কেজি ওজনের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। এটি মাটির নিচে সংরক্ষিত আছে বলে দাবি করে ওয়াশিংটন এবং পেন্টাগন এটি নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানের জন্য এই মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের (২০ বিলিয়ন ডলার)। প্রয়োজন।

আলোচনার শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তা (খাদ্য ও ওষুধ) ক্রয়ের জন্য মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরান এর বিনিময়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার দাবি করে। দীর্ঘ দর-কষাকষির পর বর্তমানে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাব। তবে ইরানের এই অর্থ ব্যবহারের শর্তাবলি এবং ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলার: কোন কোন দেশে জব্দ, অবমুক্ত হলে ফায়দা কতটাইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলার: কোন কোন দেশে জব্দ, অবমুক্ত হলে ফায়দা কতটা

ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ইরান তাদের সব পারমাণবিক উপাদান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু ইরান কেবল তাদের দেশেই ইউরেনিয়ামের মান কমিয়ে ফেলতে রাজি হয়েছে। বর্তমানে একটি আপস প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশে পাঠানো হতে পারে এবং বাকিগুলোর মান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে ইরানেই কমিয়ে ফেলা হবে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিন পৃষ্ঠার এই খসড়া চুক্তিপত্রে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো-

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে স্থগিতাদেশ: ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর একটি ‘স্বেচ্ছা’ স্থগিতাদেশের বিষয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের মেয়াদ চাইলেও ইরান তা ৫ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছে।

পারমাণবিক স্থাপনা: ইরান কেবল চিকিৎসার কাজে প্রয়োজনীয় আইসোটোপ তৈরির জন্য গবেষণামূলক রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করতে পারবে। তবে শর্ত হলো, তাদের সব পারমাণবিক স্থাপনা হতে হবে ভূপৃষ্ঠের ওপরে। বর্তমানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে অচল রাখতে হবে।

হরমুজ প্রণালি: এই নৌপথের নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়েও সমঝোতা চুক্তির খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে; তবে এখানে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

অস্পষ্টতা ও চ্যালেঞ্জ

এই চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল বা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (প্রক্সি) বিষয়ে কোনো উল্লেখ আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইসরায়েল এবং ওয়াশিংটনের রিপাবলিকান নেতারা দাবি করেছেন, যেকোনো চুক্তিতে এই বিষয়গুলো অবশ্যই থাকতে হবে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির সময় ওবামা প্রশাসনকে অর্থ ছাড়ের জন্য ট্রাম্প নিজে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ফলে এবার ট্রাম্প প্রশাসন অর্থ ব্যবহারের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টা করছে।

মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান কিছুটা নমনীয় হয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। তাদের আরও সামনে এগিয়ে নিতে কী প্রয়োজন, তা আমরা দেখব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরান ২০ বিলিয়ন ডলার এবং নিষেধাজ্ঞা ছাড়া তেল বিক্রির সুবিধা চায়, কিন্তু তারা একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি ও হামাসের মতো গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করার ইচ্ছাও ছাড়তে চাচ্ছে না।’

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এই আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ বললেও গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি। অন্যদিকে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জানিয়েছেন, ট্রাম্প সরাসরি ইরানিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের মধ্যে একটি ফোনালাপ বেশ ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ ছিল।

অবশ্য গতকাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি। ইরান একটি শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তারা আমাদের নিউক্লিয়ার ডাস্ট দিতেও সম্মত হয়েছে। যদি চুক্তি না হয়, তবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হবে।’

এদিকে আজ শুক্রবার তুরস্কের একটি কূটনৈতিক ফোরামের ফাঁকে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের কর্মকর্তারা একটি চতুর্পক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। সেখানে এই শান্তিপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে বলেও জানা গেছে।



banner close
banner close