একসময় ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য হিসেবে পরিচিত কানাডায় যাওয়ার আবেদন ব্যাপকভাবে কমেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির একটি বিদেশে পড়াশোনা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে কানাডার জন্য আবেদন প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কানাডার অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়দের অংশ ছিল ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ নেমে এসেছে মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশে।
দিল্লির ওই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শোভিত আনন্দ জানান, ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগ আবেদনই ছিল কানাডার জন্য। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। তিনি বলেন, মানুষ এখন আর কানাডায় আবেদন করতে আগ্রহী নন এবং ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানটিতে এখনও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় রয়েছে, তবে কানাডার জন্য তেমন কেউ আসছেন না।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি পারমিটের সংখ্যায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ২০২৫ সালে এই সীমা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৩৭ হাজার। এ ছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আর্থিক যোগ্যতার শর্ত কঠোর করা হয়েছে। গ্যারান্টিড ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের পরিমাণ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২২ হাজার ৮৯৫ কানাডিয়ান ডলারে উন্নীত করা হয়েছে।
ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা ৫২ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের কিছু মাসে ভারতীয় আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার ৭৪ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এ ছাড়া স্টুডেন্ট ডাইরেক্ট স্ট্রিম নামের দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা ২০২৪ সালের শেষের দিকে বন্ধ করা হয়েছে। জাল আবেদন, ক্লাসে অনুপস্থিতি ও আশ্রয় আবেদন বৃদ্ধির অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পরামর্শক সুশীল সুখওয়ানি বলেন, এত বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। তার ওপর ভিসা না পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় অনেকে আবেদন করতে দ্বিধা করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারগুলো কানাডাকে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে দেখতেন। বেসরকারি কলেজে তুলনামূলক সহজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং পরবর্তীতে স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা এর প্রধান কারণ ছিল। তবে বর্তমান নীতির কারণে এই পথ আর আগের মতো সহজ নয়। চাকরির সুযোগ কমে যাওয়া এবং উচ্চ খরচের পরেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শোভিত আনন্দ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দুই বছর আগে কানাডায় যাওয়া এক শিক্ষার্থী কোর্স শেষ করে স্থায়ী কাজ খুঁজে পাননি। খণ্ডকালীন কাজ করে চলতে হয়েছে তাকে এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে এসেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়েছেন। কারণ তাদের আবেদন মূলত উচ্চমানের শিক্ষার জন্য, অভিবাসনের উদ্দেশ্যে নয়।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছুটা উন্নতির পরও কানাডার প্রতি আকর্ষণ সামগ্রিকভাবে কমেছে। দিল্লির শিক্ষার্থী তনিষ্ক খুরানা বলেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ও ভর্তি সীমাবদ্ধতার কথা শুনে তিনি নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন। তবে পারিবারিক কারণে এখনও কানাডায় পড়ার পরিকল্পনা ছাড়েননি তিনি।
অনেক শিক্ষার্থী এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকছেন। কানাডা সরকারের নীতি পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আরও পড়ুন:








