আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার খুব কাছাকাছি চলে যেতে পারে। সংস্থাটির ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে তেল, গ্যাস ও খাদ্যের দাম চলতি বছর এবং আগামী বছরজুড়ে উচ্চমাত্রায় থাকলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। এমন অবস্থা ১৯৮০ সালের পর মাত্র চারবার দেখা গেছে, সর্বশেষ কোভিড-১৯ মহামারির সময়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পরপরই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। গত সপ্তাহে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। আইএমএফ জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি আবার পথচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংস্থাটির মতে, তেলের দাম চলতি বছর গড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার এবং ২০২৭ সালে ১২৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আগামী বছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ছয় শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করবে।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ের গুরিনশাস জানিয়েছেন, বৈশ্বিক পরিসংখ্যান দেখলে মন্দার ধারণা কিছুটা অস্পষ্ট মনে হয়। তবে দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কাছে মন্দার সময়ের মতোই অনুভূত হবে। এতে বেকারত্ব বাড়বে এবং কিছু দেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
যুদ্ধের শুরুতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে তা কমে এসেছে। আজ মঙ্গলবার এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৮৫ ডলারে।
আইএমএফ জানিয়েছে, যদি এই গুরুতর পরিস্থিতি দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলে তাহলে মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়বে। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাতের সমাধান হলে এবং চলতি বছরের মাঝামাঝি মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে। এটি আগের ৩ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস থেকে কম। আগামী বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশেই রাখা হয়েছে।
উন্নত অর্থনীতির মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আইএমএফ মনে করছে। চলতি বছর যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে। পরের বছর এটি আবার ১ দশমিক ৩ শতাংশে উঠতে পারে।
উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোতেও এ বছর অর্থনৈতিক সংকোচন দেখা যেতে পারে। ইরানের অর্থনীতি চলতি বছর ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হবে। যুদ্ধ শেষ হলে ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব। কাতারের অর্থনীতি ২০২৬ সালে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং পরের বছর একই হারে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ইরাকের প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কমবে এবং ২০২৭ সালে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং পরের বছর ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।
অপরদিকে রাশিয়া তেলের দাম বৃদ্ধির সুবিধা পাবে। দেশটির প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ও আগামী বছর ১ দশমিক ১ শতাংশ হবে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
আইএমএফ জানিয়েছে, প্রত্যেক দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি, হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা এবং বিকল্প রপ্তানি পথের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করবে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব পূর্বাভাস সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
তথ্যসূত্র: আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদন ও বিবিসি।
আরও পড়ুন:








