ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের একাধিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। এসব হামলায় কাতারের রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রসহ সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল-গ্যাস স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার ফলে জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তুরস্কের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও ন্যাটো-ধরনের আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা এখনও দূরপরাহত।
ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান শিল্প নগরীতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি কেন্দ্র। এতে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ বিলিয়ন ডলারের হতে পারে। সৌদি আরবের রিফাইনারি ও অন্যান্য স্থাপনায়ও হামলা হয়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এসব হামলার বিরুদ্ধে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।
তুরস্ক এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করছে। কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৩ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং দোহার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে আকিনজি ড্রোন চুক্তি (প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার) ছাড়াও সম্ভাব্য ৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা চলছে। তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের কেএএএন স্টিলথ ফাইটার প্রোগ্রামে সৌদি আরবের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা অগ্রসর হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের সঙ্গেও ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও সহযোগিতায় অংশীদারত্ব বাড়ছে।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইউরোপীয় ইউনিয়নের মডেল অনুসরণ করে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে কোনো দেশের আধিপত্য থাকবে না। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলী বাকিরের মতে, তুরস্কের উচিত উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়ানো, যা এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে ত্বরান্বিত করবে। তিনি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো-ধরনের আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট গঠনের পথে প্রধান বাধা হলো দেশগুলোর ভিন্ন কৌশলগত অগ্রাধিকার। সৌদি আরব আঞ্চলিক নেতৃত্ব চায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চায় এবং ওমান নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পছন্দ করে। অঞ্চলে কোনো সমন্বিত কমান্ড কাঠামো বা অভিন্ন সামরিক মতবাদ নেই। গাল্ফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের ফেলো সিনেম চেঙ্গিজের মতে, আনুষ্ঠানিক জোটের পরিবর্তে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ভিত্তিতে শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে উঠছে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অস্ত্র-প্রযুক্তি হস্তান্তরের দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধের দীর্ঘায়ু এই সমন্বয়কে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তবে কাঠামোগত ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আনুষ্ঠানিক জোট গঠন এখনও সম্ভবপর নয়।
আরও পড়ুন:








