লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলা ও চলমান সংঘাতের কারণে দেশটিতে অবস্থানরত শত শত বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী কাজ ও বাসস্থান হারিয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে এসব কর্মী বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে খোলা আকাশের নিচে, রাস্তাঘাটে ও গাছতলায় আশ্রয় নিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠ দাহিয়ে এবং সিয়াহ এলাকায় হামলা তীব্র হওয়ায় সেখানকার বেশির ভাগ বাংলাদেশি কর্মী বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়। হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দক্ষিণাঞ্চলের সিয়াহ এলাকার আল আসাদ নামক স্থানে আশ্রয় নেওয়া অন্তত ২৫ বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা সবাই আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কিন্তু আকস্মিক হামলা শুরু হলে কাজ ফেলে প্রাণ বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন। কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, দিনাজপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের এসব কর্মীর অধিকাংশই নারী। তাঁরা জানান, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তাঁরা খোলা মাঠে ও রাস্তার পাশে অবস্থান করছেন। হামলা ও বোমাবর্ষণের ভয়ে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করছেন। তাঁদের অনেকের চাকরির বকেয়া বেতন আটকে রয়েছে।
বৈরুতের দাহিয়ে এলাকা থেকে সপরিবারে পালিয়ে আসা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা এখলাসুর রহমান জানান, তিনি একটি রেস্টুরেন্টে রাতের শিফটে কাজ করতেন। গত ১৫ মার্চ রাতে হঠাৎ হামলা শুরু হলে কাজ ফেলে স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে যান। তাঁর দেড় হাজার ডলারের বেশি বকেয়া বেতন আটকে আছে। কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর। তিনি আরও জানান, যে ভবনে তাঁর কর্মস্থল ছিল, তা হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
একই এলাকার বাসিন্দা মাজদা গাড়ি কোম্পানির সাবেক কর্মী বারেক হাসান বলেন, তিনি এখন একটি গাছের নিচে থাকেন। তাঁর স্ত্রী অন্য কয়েকজন নারী কর্মীর সঙ্গে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। ১৫ দিন ধরে তিনি ঘরে ঘুমাতে পারেননি। সিয়াহ এলাকার ভাড়া বাসা থেকেও তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে। নতুন বাসা ভাড়া নেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। বৃষ্টি ও ঠাণ্ডায় চরম কষ্ট হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন জানান, সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকেই দূতাবাস ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের সন্ধানে কাজ করছে। দক্ষিণাঞ্চলে বেশির ভাগ কর্মী কৃষি খামার ও বাড়িতে কাজ করতেন। হামলার পর তাঁদের অনেকেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দূতাবাস তাঁদের বৈরুত বা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় চলে আসার পরামর্শ দিচ্ছে এবং প্রয়োজনে গাড়ির ব্যবস্থা করছে। তিনি বলেন, অনেকে পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসতে রাজি হচ্ছেন না। দূতাবাস খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চলাচলের পথ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম সূত্রে জানা গেছে, লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় বাস্তুচ্যুত বাংলাদেশি কর্মীদের তালিকা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মী স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আইওএম ওই কর্মীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আইওএম যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, লেবাননে চলমান সংঘাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এদের মধ্যে অভিবাসী কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সংস্থা দুটি জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশিদের আটকে পড়া বেতন ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠের আশরাফিয়া এলাকায় আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন কর্মী জানান, তাঁরা কয়েক মাসের বেতন পাননি। চাকরি হারানোর পাশাপাশি তাঁদের সঞ্চয়ও শেষের পথে। তাঁরা দ্রুত দেশে ফেরার সুযোগ চাচ্ছেন।
লেবাননে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জাভেদ তানভীর খান সম্প্রতি এক বার্তায় জানান, দূতাবাস ক্ষতিগ্রস্ত সব বাংলাদেশির পাশে আছে। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণ ও দূতাবাসের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা অব্যাহত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি কর্মীদের দুর্দশা আরও গভীর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো এ সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে না এলে আরও বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
আরও পড়ুন:








