সোমবার

১৬ মার্চ, ২০২৬ ২ চৈত্র, ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্য সংকট: ইরানের কৌশলে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ মার্চ, ২০২৬ ২২:১২

শেয়ার

মধ্যপ্রাচ্য সংকট: ইরানের কৌশলে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন
ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের মধ্যেও ইরানের কৌশলগত পদক্ষেপের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হাতে থাকা যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই জটিল ও বহুমাত্রিক আকার ধারণ করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংঘাতের সমাপ্তি নির্ধারণে তেহরানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ইসরাইলের আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশে প্রায় বাধাহীন অভিযান চালায়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে। জবাবে ইরান ইসরাইলের দিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার অধিকাংশ ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এসব হামলায় ইসরাইলে ১২ জন নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা তুলনামূলক কম সফল হলেও এসব দেশের বাসিন্দা ও অবকাঠামো রক্ষা করতে গিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথে পরিবাহিত হয়। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় পর্যায় থেকেই চাপের মুখে পড়েছেন।

জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখের মতে, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এখনও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার ভাষ্য, যুদ্ধের এজেন্ডা নির্ধারণ করাই নিয়ন্ত্রণের মূল দিক। অন্যদিকে, কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যানের বিশ্লেষণ বলছে, ইরান খারাপ অবস্থান থেকেও পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে কাজে লাগাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বর্তমানে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে ট্রাম্প অন্যান্য দেশকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানালেও এখনো কেউ সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, শত শত তেলবাহী জাহাজকে সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং এর জন্য বিপুল সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হবে। প্রণালিটির পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও তারা মনে করেন। ইরানের একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন বা বিস্ফোরকভর্তি ছোট নৌযানও ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম। প্রণালি পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তেহরানকে নিতে হবে বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বড় সাফল্য থাকলেও তার কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ফল পাওয়া যায়নি। শাসনব্যবস্থা দুর্বল মনে হলেও এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। ইসরাইলি ভাষ্যকার ইয়োভ লিমোরের মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর শাসকগোষ্ঠীর শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মম দমনপীড়নের কারণে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।

এদিকে ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়ারা এখনো পুরোপুরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়ায়নি। ইয়েমেনের হুতিরাও এখনো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। লেবাননে হিজবুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরাইলকে বিস্মিত করেছে। এরপর থেকে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে ধারাবাহিকভাবে গোলাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে, যাতে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় আট লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর লেবানন বিশ্লেষক ডেভিড উড বলেন, হিজবুল্লাহর হাতে ইরানের মতো সমান শক্তির অবস্থান নেই। ইসরাইলের লক্ষ্য হিজবুল্লাহকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে পুরোপুরি নির্মূল করা, যদিও তা অর্জনের পদ্ধতি এখনো অস্পষ্ট। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর একটাই স্পষ্ট লক্ষ্য—টিকে থাকা। সংঘাতের শুরুতে হিজবুল্লাহ ইসরাইলকে বিস্মিত করলেও ইসরাইলের বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মুখে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।



banner close
banner close