বৃহস্পতিবার

১২ মার্চ, ২০২৬ ২৮ ফাল্গুন, ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল: প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ মার্চ, ২০২৬ ০৮:১০

শেয়ার

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল: প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব
ছবি সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাত এক নতুন কৌশলগত মোড় নিয়েছে। ইরান তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙার বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত এই বহুমুখী আক্রমণ পদ্ধতি কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটগুলোকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, ইরানের এই পদক্ষেপের ফলে সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি তেল ও গ্যাস অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংঘাতের বিস্তৃতি সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিশেষ করে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় ড্রোন আঘাত হানার ফলে যাত্রী পরিবহন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। এপি নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বাণিজ্যিক শিপিং রুটগুলোতে এই অস্থিরতা আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ স্ট্রেট অব হরমুজে সৃষ্ট এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্যে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখানে স্যাচুরেশন স্ট্র্যাটেজি বা সম্পৃক্তকরণ কৌশল প্রয়োগ করছে। এই পদ্ধতিতে রাডার ও ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমগুলোকে বিভ্রান্ত করার জন্য একসাথে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ১,৪৪০টিরও বেশি ড্রোন এবং ২৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকগুলো হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও, কৌশলগত কারণে কিছু আঘাত বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি ও পানি সরবরাহ অবকাঠামোতে এ ধরনের আক্রমণ সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের এই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত চাপের মূল লক্ষ্য হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করা।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি ও বিপজ্জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাত ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, ইউনাইটেড নেশনস সিকিউরিটি কাউন্সিল (ইউএনএসসি) থেকে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা হলেও ইরান তার বর্তমান কৌশল অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিল এবং ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান তার মডুলার স্ট্রাইক ও বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড স্ট্রাকচারের মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করছে। এই পদ্ধতিতে প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমিয়ে আনা হয় এবং কমান্ড স্তরগুলোকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা হয়। মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ বাহিনী ইরানের এই সক্ষমতা হ্রাসে কাজ করলেও ইরান প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কৌশলের পরীক্ষা চালাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, এই সংঘাত কেবল সামরিক শক্তিমত্তার লড়াই নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।



banner close
banner close