ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক ব্যক্তির লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, যা প্যাসিভ ইথানেশিয়া নামে পরিচিত। দীর্ঘ ১৩ বছর শয্যাশায়ী ও সবলভাবে বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই—এমন এক রোগীর ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
আদালতের অনুমতি পাওয়া ব্যক্তির নাম হরীশ রানা। তার বর্তমান বয়স ৩২ বছর। ২০১৩ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ওই ঘটনায় তিনি কোয়াড্রিপ্লেজিয়ায় আক্রান্ত হন এবং সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। গত ১৩ বছর ধরে তিনি ভেজিটেটিভ স্টেটে আছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। অর্থাৎ বাইরের জগৎ সম্পর্কে তার কোনো সচেতনতা নেই এবং শরীরের চারটি অঙ্গই অচল। শুধু কৃত্রিম লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে তার শ্বাস-প্রশ্বাস ও শারীরিক কার্যক্রম সচল রাখা হচ্ছিল।
এই অবস্থায় হরীশের বাবা-মা আদালতে আবেদন জানিয়ে বলেন, তাদের ছেলের সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই এবং তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা অর্থহীন ও কষ্টকর। আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নয়ডা জেলা হাসপাতালে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয়। ওই বোর্ড হরীশের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।
মঙ্গলবার বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ এই মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে হরীশ রানার কৃত্রিম লাইফ সাপোর্ট বন্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে জানায়, ভারতে সক্রিয় ইথানেশিয়া বা প্রত্যক্ষভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করার পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইথানেশিয়া বা লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, যদি রোগীর অবস্থা অপরিবর্তনীয় হয় এবং তার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়।
আদালত এই মর্মে কেন্দ্রীয় সরকারকে সুপারিশ করেছে, ইথানেশিয়া সংক্রান্ত একটি স্পষ্ট ও সমন্বিত আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য। রায়ে শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট নাটকের বিখ্যাত উক্তি টু বি অর নট টু বি-এর উল্লেখ করে বিচারপতিরা বলেন, জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন অনেক সময় গভীর নৈতিক ও মানবিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে।
এই রায়কে ভারতের বিচারব্যবস্থা ও চিকিৎসানীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে জটিল চিকিৎসা ও মানবাধিকার বিষয়ক মামলাগুলোর জন্য পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
আরও পড়ুন:








