মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এর মধ্যেই বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে ইরান। একই সঙ্গে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা-পাল্টাহামলার খবর পাওয়া গেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বাহরাইনের জুফায়রে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরানের দাবি, কেশম দ্বীপের একটি পানির প্লান্টে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। এর আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ওই হামলার ফলে ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, হামলার সময় সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে ইরান জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আগে হামলা না হলে তারা নতুন করে হামলা চালাবে না। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আক্রমণ শুরু না হলে ইরান তাদের লক্ষ্য করে হামলা করবে না।
অন্যদিকে কাতার জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতেও ইরানের ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরানি গণমাধ্যম তাসনিম। সেখানে একটি মার্কিন স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ও রাডার ব্যবস্থায় আঘাত হানার কথা বলা হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
আইআরজিসির এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সামরিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এতে হাইপারসোনিক ‘ফাতাহ’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ‘এমাদ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এসব ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিতে চলতে সক্ষম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, তারা একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, দক্ষিণাঞ্চলে ১২টি ইরানি ড্রোন ও ১৪টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত তিন দিনে ইরানের নৌবাহিনীর ৪২টি জাহাজ ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানের বিমান বাহিনী ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, “ইরানকে খুব কঠিনভাবে আঘাত করা হবে।” তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযান শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এতে আইআরজিসির কুদস ফোর্সের অন্তত ১৬টি বিমান ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে অন্তত ৬ হাজার ৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রকাশিত ওই তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ৫৩৫টি আবাসিক ভবন, ১ হাজার ৪১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র, ৬৫টি বিদ্যালয় এবং রেড ক্রিসেন্টের ১৩টি কেন্দ্র।
এদিকে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গত সোমবার থেকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী ঘাঁটিতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ঘানার তিনজন শান্তিরক্ষী গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব, ঘানা ও জার্মানি তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে ফোনালাপে ইরান ইস্যুতে সংলাপের পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক হস্তক্ষেপ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন:








