দক্ষিণ স্পেনে একটি উচ্চগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় ট্রেনটিও লাইনচ্যুত হয়ে পাশের ঢালে পড়ে যায়। স্থানীয় সময় রবিবার রাজধানী মাদ্রিদ থেকে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে কর্ডোবা প্রদেশের আদামুস এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানান, দুর্ঘটনার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। মাদ্রিদের আতোচা স্টেশনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সোজা রেলপথে এমন লাইনচ্যুতি ‘খুবই অদ্ভুত’। তিনি আরও জানান, ওই রেলপথের অংশটি গত মে মাসে সংস্কার করা হয়েছিল।
আঞ্চলিক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আহত অন্তত ১৮ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টেলিভিসিওন এস্পানিওলা জানায়, মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী একটি ট্রেনের চালক নিহতদের মধ্যে রয়েছেন। এ ছাড়া মোট ১০০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৫ জনের অবস্থা গুরুতর।
রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানায়, ‘আইরিও ৬১৮৯ মালাগা–মাদ্রিদগামী ট্রেনটি আদামুজ এলাকায় লাইনচ্যুত হয়ে পাশের লাইনে পড়ে যায়। একই লাইনে চলাচলরত মাদ্রিদ–হুয়েলভাগামী ট্রেনটিও এ সময় লাইনচ্যুত হয়।’ আদিফ জানায়, সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে (১৭৪০ জিএমটি) দুর্ঘটনাটি ঘটে, কর্দোবা ছাড়ার প্রায় ১০ মিনিট পর।
আইরিও একটি বেসরকারি রেল অপারেটর, যার অধিকাংশ মালিকানা ইতালির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেলগোষ্ঠী ফেরোভিয়ে দেলো স্তাতো-এর হাতে। সংশ্লিষ্ট ট্রেনটি ছিল ফ্রেচিয়া ১০০০ মডেলের, যা মালাগা থেকে মাদ্রিদ যাচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে ঘটনার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, জরুরি সব প্রোটোকল সক্রিয় করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় ট্রেনটি ছিল আলভিয়া, যা রাষ্ট্রীয় রেল অপারেটর রেনফে পরিচালিত। দৈনিক এল পাইস জানায়, সংঘর্ষের সময় ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার। রেনফে জানায়, আইরিও ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে তাদের ট্রেনের সামনে পড়ায় দুর্ঘটনা ঘটে। যাত্রী উদ্ধারে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো কাজ করছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে সব ধরনের রেল যোগাযোগ স্থগিত করেছে আদিফ।
আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক স্বাস্থ্য প্রধান আন্তোনিও সানজ জানান, ছয়জন গুরুতর ও পাঁচজন খুবই গুরুতর আহতসহ আরও কয়েকজন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন ছিল এবং একটি ট্রেন প্রায় চার মিটার নিচের খাদে পড়ে গেছে। ‘আমরা খুব জটিল একটি রাতের আশঙ্কা করছি। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে,’ বলেন তিনি।
কর্দোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান পাকো কারমোনা জানান, আইরিও ট্রেনের যাত্রীদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে নেয়া হলেও রেনফে ট্রেনটির বগিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘এখনও কয়েকজন ভেতরে আটকে আছেন। সংকীর্ণ জায়গা থেকে তাদের উদ্ধার করাই মূল চ্যালেঞ্জ,’ বলেন তিনি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সোমবারের সব কর্মসূচি বাতিল করে দুর্ঘটনা পরিস্থিতি তদারকির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজা ও রানি পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন বলে রাজপ্রাসাদের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন। উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিতে দুর্ঘটনাস্থলের কাছের একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
আইরিও ট্রেনে ৩০০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন এবং রেনফে ট্রেনে ছিলেন প্রায় ১০০ জন। দুর্ঘটনার পর আদামুজ শহরে যাত্রীদের জন্য একটি অস্থায়ী সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা খাবার ও কম্বল নিয়ে সেখানে সহায়তা করছেন।
এক যাত্রী মারিয়া সান হোসে বলেন, ‘অনেক আহত মানুষ ছিল। আমি এখনো কাঁপছি।’ আরেক যাত্রী জানান, ‘মানুষ চিৎকার করছিল, লাগেজ পড়ে যাচ্ছিল।’ উদ্ধারকাজ চলাকালে যাত্রীরা জরুরি হাতুড়ি দিয়ে জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন:








