শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিউইয়র্ককে আরও সাশ্রয়ী করে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন শহরটির নতুন মেয়র জোহরান মামদানি।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) মেয়র হিসাবে শপথ গ্রহণের পর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্ককে আরও সাশ্রয়ী করে গড়ে তুলতে কঠোর ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। খবর বিবিসি, এএফপি ও আলজাজিরার।
মেয়র মামদানি আরও বলেন, যেসব ধনকুবের ও অভিজাত শ্রেণি মনে করেন∏গণতন্ত্র কিনে নেওয়া যায়, তাদের কাছে কোনো জবাবদিহি নয়। আমরা জবাবদিহি করব নিউইয়র্কবাসীর কাছে। আমি একজন ডেমোক্রেটিক সমাজতানি্ত্রক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছি∏সে অনুযায়ী শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করব। অভিষেকের উত্সবের পরপরই আবাসন পরিকল্পনা শুরুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাড়ি নিশ্চিত করা কোনো অস্বাভাবিক কাজ নয়। বরং এটি সঠিক ও ন্যায্য কাজ।
শপথ নেওয়ার পর দেওয়া এক ভাষণে মামদানি বলেন, অনেকেই আমাদের দিকে নজর রাখছে। তারা জানতে চান—বামপন্থিরা শাসন করতে পারে কি না। তারা জানতে চান—যেসব সংগ্রাম তাদের ভোগাচ্ছে, সেগুলোর সমাধান আদেৌ সম্ভব কি না।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বের সামনে একটি উদাহরণ স্থাপন করব। ৩৪ বছর বয়সি মামদানি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মেয়র নির্বাচনে জোরালো প্রচারণা চালিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। নিউইয়র্কের ৮০ লাখ বাসিন্দার অনেকের আশা, মামদানি একজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
নতুন বছরের শুরুতে নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানাতে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সিটিতে জনতার ঢল নামে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহর হিসাবে পরিচিত নিউইয়র্কের সাত ব্লকজুড়ে চলে বর্ণাঢ্য পার্টি। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় ‘ধনীদের ওপর কর আরোপের’ স্লোগান। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জোহরান মামদানি। চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
মামদানির অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো নিউইয়র্ক সিটিতে করপোরেট করের হার ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, যা প্রতিবেশী অঙ্গরাজ্য নিউ জার্সির সমান। পাশাপাশি বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাবও রয়েছে।
মামদানির ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা বিভিন্ন ভিডিও। নির্বাচনি প্রচার কৌশলের অংশ হিসাবে তিনি এসব ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। এমনই এক ভিডিওতে দেখা যায়, কনি আইল্যান্ডে জানুয়ারির কনকনে শীতে ঠান্ডা পানিতে ডুব দিচ্ছেন তিনি। এরপর উঠে এসে রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘আই অ্যাম ফ্রিজিং...ইয়োর রেন্ট।’
এ কথা দিয়ে তিনি আসলে বুঝিয়েছেন—ঠান্ডায় তিনি জমে যাচ্ছেন। আবার একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন, মেয়র নির্বাচিত হলে নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের জন্য বাড়িভাড়াও যাতে না বাড়ে, সে ব্যবস্থা করবেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ জোহরান মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজের এমন এক অকৃত্রিম ও প্রাণবন্ত ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন∏যা নিউইয়র্কের মানুষদের আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকা তরুণ প্রজন্মের সমর্থন আদায়ে সফল হয়েছে—তার এ প্রচার কৌশল।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেন হল বলেন, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীদের নিয়ে হতাশ ছিলেন তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তিশালী প্রচার কৌশল মামদানিকে তরুণদের কাছে তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থী হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।
জেন হল আরও বলেন, তরুণ ভোটারদের কাছে টানতে প্রার্থীকে তরুণ হতে হয় না। তবে তার ব্যক্তিত্ব হতে হবে অকৃত্রিম। মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে আধুনিক ও আকর্ষণীয়ভাবে কথা বলতে হবে। তবে মামদানি হোয়াইট হাউজের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করবেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে—এর ওপরই তার নির্বাচনি এজেন্ডাগুলোর বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে।
ইতিহাসের সাক্ষী হতে জোহরান মামদানির শপথ অনুষ্ঠানে ভিড় করেছিলেন অর্ধলাখ মানুষ। এ ব্যাপারে অধ্যাপক আইওনা লিটারেট সতর্ক করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মেয়রের কাজের মিল না থাকলে এ ‘ভাইরাল’ সমর্থন দ্রুতই ক্ষোভে রূপ নিতে পারে।
আরও পড়ুন:








