যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলায় ইরানের বড় তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে বেশ ভালো রকমের উদ্বিগ্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ইরান তাদের ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে নিতে পারেনি। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারণা, বাস্তবতা এতটা সরল নয়।
আইএইএর মতে, হামলায় ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ফর্দোসহ অন্যান্য স্থাপনায় সেন্ট্রিফিউজার ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে ইরানের প্রায় ৯ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হয়েছে? এর মধ্যে ৪০০ কেজি ছিল ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের খুব কাছাকাছি।
আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, হামলার ঠিক আগের দিন ইরান জানিয়েছিল তারা তাদের পারমাণবিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু হামলার পর সেখানে ঢোকার সুযোগ না পাওয়ায় সংস্থাটি নিশ্চিতভাবে জানাতে পারছে না ইউরেনিয়াম মজুতের কী পরিণতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার আগে ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের বাইরে ট্রাকের সারি দেখা গেছে স্যাটেলাইট চিত্রে। এর মানে হতে পারে ইরান আগেভাগেই ইউরেনিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সরিয়ে নিয়েছে। পশ্চিমা একাধিক কূটনীতিকও একই আশঙ্কা করছেন।
আইএইএর সাবেক প্রধান পরিদর্শক অলি হেইনোনেন বলেন, এখন এই ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংস হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও সরানো হয়েছে, তা নির্ধারণ করা হবে অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ধ্বংসস্তূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ এবং পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ ছাড়া এর সুরাহা কঠিন।
ইরানের পার্লামেন্ট ইতোমধ্যে আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিতের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তেহরান দাবি করছে, তারা সব সময়ই পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে স্বচ্ছ থেকেছে এবং তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো মনে করছে, ইরান অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা না বাড়ালেও সেই পথ খোলা রেখেছে।
অন্যদিকে, ইতিহাসের দিকে তাকালে ২০০৩ সালে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা অভিযোগের উদাহরণ সামনে চলে আসে। তখনো জাতিসংঘের পরিদর্শকরা নিশ্চিত হতে পারেনি, এবং যুদ্ধের পর দেখা যায়, সেই অস্ত্রের অস্তিত্বই ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা আবারো নতুন করে সামনে আসছে।
আইএইএ বলছে, ইউরেনিয়ামের প্রতিটি গ্রাম শনাক্ত করা এবং তার হিসাব রাখা অত্যন্ত কঠিন। বর্তমানে নাতাঞ্জের ভূ-উপরিস্থ অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ফর্দো ও ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ অংশের কী অবস্থা, তা নিশ্চিত নয়।
এ মুহূর্তে আইএইএর হাতে যথেষ্ট তথ্য নেই। তারা যেমন বলতে পারছে না ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর পথে হাঁটছে, তেমনি এটাও নিশ্চিত করতে পারছে না, ইরান পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ছায়া সরাতে হলে ইরান, আইএইএ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বচ্ছ সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন:








