বুধবার

৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২০ কার্তিক, ১৪৩৩

সর্বশেষ
শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলে ক্ষতি বাড়বে: শফিকুর রহমান এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা শুরু ১ ডিসেম্বর, দুই বিষয়ে সুযোগ সিনেটের পর প্রতিনিধি পরিষদও ডেমোক্র্যাটদের দখলে; চাপে ট্রাম্প প্রশাসন দেশে ডেঙ্গুতে আরও ছয় জনের মৃত্যু; হাসপাতালে ভর্তি এক হাজার ৮৬৬ জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে স্বল্প বেতনে শ্রমিকদের জীবনযাপন অসম্ভব: ডা. শফিকুর রহমান মার্কিন সিনেটে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারী অ্যাবের কাওয়াস চুয়াডাঙ্গার আনসারবাড়ীয়া রেলস্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ স্টেশন ও মাস্টার নিয়োগের দাবিতে এলাকাবাসীর ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম

এইচএসসিতে ফলাফল বৈষম্য: মেধার পার্থক্য, নাকি ব্যবস্থার?

মাহতাব মুহাম্মদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১৬:৫৮

শেয়ার

এইচএসসিতে ফলাফল বৈষম্য: মেধার পার্থক্য, নাকি ব্যবস্থার?
মাহতাব মুহাম্মদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রতিবছর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে বিভিন্ন বোর্ড ও স্কুল-কলেজগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ফলাফল ব্যবধান দেখা যায়। এবার এইচএসসি ২০২৬-এর ফলাফল প্রকাশের পরও তীব্র ফলাফল ব্যবধান লক্ষ করা গেছে। এই ব্যবধান যেমন বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে দেখা গেছে, তেমনি দেখা গেছে বিভিন্ন কলেজের মধ্যেও। পূর্বের বছরগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলেও এবারের এইচএসসি পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে: একই পাঠ্যক্রম, একই সিলেবাস, একই প্রশ্নপত্র ও একই মূল্যায়ন কাঠামোর অধীনে পড়াশোনা করেও ফলের ব্যবধান এত বেশি কেন হলো?

এবার ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন নিবন্ধন করা পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন, গত বছর যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন; অর্থাৎ এবার প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে। তবে ফলাফলের গড় সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রেই আসল চিত্রকে আড়াল করে। গড়ের নিচে লুকিয়ে আছে বোর্ডভেদে, এমনকি একই উপজেলার কলেজভেদেও বিশাল ফারাক ও ফলাফলবৈষম্য। সাধারণ বোর্ডগুলোর মধ্যে এবার ঢাকায় পাসের হার ৬১.৮০ শতাংশ, আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা বরিশালে ৪৪.৮৪ শতাংশ— ব্যবধান প্রায় ১৭ শতাংশ। মাঝখানে রয়েছে চট্টগ্রাম ৫২.০৭ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৫১.৪৪ শতাংশ, সিলেট ৫০.৯০ শতাংশ, কুমিল্লা ৪৮.০৪ শতাংশ, দিনাজপুর ৪৫.৯৮ শতাংশ, রাজশাহী ৪৫.০৬ শতাংশ ও যশোর ৪৪.৯২ শতাংশ। এছাড়া মাদরাসা বোর্ডে ৬১.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে ৪৯.৪৩ শতাংশ পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে। তবে বোর্ডের অবস্থান প্রতিবছর এক থাকে না। গত বছর ঢাকার পাসের হার ছিল ৬৪.৬২ শতাংশ, আর সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল কুমিল্লা। এই ওঠানামা প্রমাণ করে যে, এই ব্যবধান কোনো বোর্ডের স্থায়ী অবস্থা নয়; বরং উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও মডারেশনে অভিন্ন মানদণ্ড বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা ও বর্তমানে এর বাস্তবায়ন কতটুকু।

বোর্ডের আলাপ পেরিয়ে স্থানীয় চিত্রের দিকে চোখ বুলালে ফলাফলবৈষম্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে গাজীপুরের কলেজগুলোর কথাই ধরা যাক। জেলার কলেজগুলোর মধ্যে ফলাফলের শীর্ষে রয়েছে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ২০২৬ সালের এইচএসসির ফলাফলে কলেজটির পাসের হার ১০০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকে ঢাকা বোর্ডের শীর্ষ ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি। কলেজটির বর্তমান পরীক্ষা কেন্দ্র হলো ধলাদিয়া কলেজ। ২০২৪ সাল থেকে গত তিন বছর যাবৎ প্রতিষ্ঠানটি এই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে আসছে। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে এবং ২০২৩ সালে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে তাদের পরীক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এইচএসসির ফলাফল বিশ্লেষণে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ পাসের হার দেখা যায় মাত্র দুইবার— একটি ২০২০ সালে (যা করোনাকালীন সারাদেশে শতভাগ অটো-পাস ছিল) এবং অন্যটি ২০২২ সালের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের সময়ে (যখন সারাদেশেই পাসের হার বেশি ছিল)। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর হার ছিল তুলনামূলক কম, যা ২০১৯ সালে ৫.৬৭ শতাংশ, ২০২০ সালে ৬৪.৯৩ শতাংশ, ২০২১ সালে ৫৬.৪৭ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৪৭.৪৮ শতাংশ। পরের বছর তারা কেন্দ্র পরিবর্তন করে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে পরীক্ষা দেয়। ২০২৩ সালে ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার পর পাসের হার ৯৯.৪২ শতাংশ হলেও জিপিএ-৫-এর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৪ জন। এরপর তারা আবার কেন্দ্র পরিবর্তন করে ২১৩৯-ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে (শ্রীপুর-৩) পরীক্ষা দেওয়া শুরু করে। আর তাতেই গত তিন বছরে তাদের পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২৪ সালে ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার প্রথম বছরই তাদের ৪৩৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়, যা মোট শিক্ষার্থীর ৮০.০৭ শতাংশ ছিল। অথচ ঠিক আগের বছর ভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার সময় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৪ জন। ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার আগে তাদের জিপিএ-৫ পাওয়ার হার কখনো ৮০ শতাংশ ছিল না। ২০২৫ সালে এই হার আরও বেড়ে শতভাগ পাস হয়। পাশাপাশি ৮৮.২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ লাভ করে। আর ২০২৬ সালে সারাদেশের সামগ্রিক পাসের হার মাত্র ৫২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র ৪০ হাজার হওয়ার পরও এ বছর এই কলেজটি শতভাগ পাসসহ ৫৯.৭৬ শতাংশ জিপিএ-৫ অর্জন করে। ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার আগে কলেজটি কখনোই টানা তিন বছর শতভাগ পাসের রেকর্ড গড়তে পারেনি এবং এত বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ ও পায়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও কানাঘুষা রয়েছে। সম্প্রতি ‘ডেইলি ক্যাম্পাস’-এ কলেজটিকে শীর্ষ ১৫ কলেজের একটি হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মন্তব্য করেছেন যে, কলেজটি ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রের বিশেষ সুবিধার কারণে টানা তিন বছর শতভাগ পাসসহ রেকর্ডসংখ্যক জিপিএ-৫ পেয়ে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করলেই তা যেমন ধ্রুবসত্য হয়ে যায় না, তেমনি বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই; কারণ ‘যা রটে, তার কিছুটা মাঝেমধ্যে ঘটেও থাকতে পারে’। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে আসার আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর শতভাগ পাস ও বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ নিশ্চিত করতে পারেনি। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রে আসার পরেই কেন ফলাফল এতটা ফুলেফেঁপে উঠল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, যা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়া অন্যান্য কলেজের চিত্রও পর্যালোচনার দাবি রাখে। যেমন— মাওনা মডেল কলেজ ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়। এ সময় ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাদের পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৫৩.৮৫ শতাংশ, ৬২.৯৬ শতাংশ এবং ৫৪.০৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে কেন্দ্র পরিবর্তন করে শ্রীপুর সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিলে পাসের হার হঠাৎ নেমে আসে মাত্র ৮.৩৩ শতাংশে। এরপর ২০২৬ সালে আবার কেন্দ্র পরিবর্তন করে ধলাদিয়া কলেজে পরীক্ষা দেয় এবং পাসের হার এক লাফে ৮৯.২৫ শতাংশে উন্নীত হয়, যা ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এখানেও ধলাদিয়া কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার পর ফলাফল রহস্যজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রমাণ মেলে।

সাইনবোর্ড মডেল কলেজের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২২ সালে রোভারপল্লী কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে তাদের পাসের হার হয়েছিল ৮৪.৬২ শতাংশ। ২০২৩ সালে কেন্দ্র পরিবর্তন করে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিলে পাসের হার দাঁড়ায় ৭৯.১৭ শতাংশ। এরপর ২০২৪ সালে ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার পর পাসের হার বেড়ে হয় ৯২.৮৬ শতাংশ। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে পাসের হার আসে যথাক্রমে ১০০ শতাংশ ও ৮৭.৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এই কলেজের ক্ষেত্রেও ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়ার পর পাসের হার বৃদ্ধির ধারা লক্ষ করা যায়।

প্রহলাদপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ ২০২১ ও ২০২২ সালে রোভারপল্লী কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে যথাক্রমে ৯৬.২৩ শতাংশ ও ৯৫.০৮ শতাংশ পাস করে। ২০২৩ সালে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিলে পাসের হার আসে ৯১.৯৫ শতাংশ। কিন্তু ঠিক পরের বছরই, অর্থাৎ ২০২৪ সালে ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার পর পাসের হার ১০০ শতাংশে চলে আসে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে পাসের হার হয় ৯৮.৯৭ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে দেশজুড়ে ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও তাদের পাসের হার ৯৮.৬৭ শতাংশ বজায় থাকে। এখানেও ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার পর পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ঊর্ধ্বগতি লক্ষণীয়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া প্রায় সব কলেজই গত পাঁচ বছরের মধ্যে (২০২১-২০২৬) অন্তত দুইবার ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্র পরিবর্তন করে এই কেন্দ্রে এসেছে। এত অল্প সময়ে বারবার কেন্দ্র পরিবর্তন করে কলেজগুলোর ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে আসার পেছনে মূল রহস্য কী? সবচেয়ে বড় কথা, এই কেন্দ্রে আসার পর কোনো কলেজেরই পাসের হার কমেনি; বরং প্রতিটি কলেজের পাসের হার রহস্যজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিপিএ-৫ প্রাপ্তি ঘটেছে অস্বাভাবিক হারে।

এর বিপরীতে যদি অন্য একটি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়, তবে তুলনামূলক স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া সম্ভব। গাজীপুরের স্বনামধন্য গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ প্রতিবছর শত শত শিক্ষার্থীকে বুয়েট ও মেডিকেলসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্যের সাথে স্থান করে দিচ্ছে। ২১৫১-গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে (গাজীপুর-৩) পরীক্ষা দিয়ে এই কলেজের ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাসের হার ছিল যথাক্রমে ১০০ শতাংশ, ৯৯.৩৮ শতাংশ, ৯৯.৬০ শতাংশ, ৯৯.১৮ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ৯৭.৮৯ শতাংশ। একই সাথে তাদের জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার ছিল মোট অবতীর্ণ শিক্ষার্থীর সাপেক্ষে যথাক্রমে ৬৪.৯৩ শতাংশ, ২২.৫৩ শতাংশ, ৫৪.৭৮ শতাংশ, ৩২.৯২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে মাত্র ১৯.৪৩ শতাংশ, যা ধলাদিয়া কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের তুলনায় অনেক কম। অথচ দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলনা করলে পাশের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকেই বুয়েট, মেডিকেলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বেশি শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়। তাহলে বেশি জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন কি ঠিকভাবে হচ্ছে নাকি যেকোনো মূল্যে জিপিএ-৫ প্রাপ্তি নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য?

একই কেন্দ্রে (গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ) পরীক্ষা দেওয়া গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফলাফলেও ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাশের হার যথাক্রমে ১০০ শতাংশ, ৯৯.১৪ শতাংশ, ১০০ শতাংশ, ৯৮.৮১ শতাংশ ও ২০২৬ সালে ৯৮.৩০ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম ঘটেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন কলেজের ক্ষেত্রে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কাজী আজিমউদ্দিন কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে তাদের পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৮৯.১৩ শতাংশ, ৯১.৪৮ শতাংশ এবং ৮০.৩৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালে কেন্দ্র পরিবর্তন করে গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে আসার পর তাদের পাসের হার বৃদ্ধির পরিবর্তে কমে ৬৭.৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি জালাল উদ্দিন মাস্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রথমবারের মতো এই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে শতভাগ ফেল করেছে।

২০২৬ সালের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দুই কেন্দ্রের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্রে ২০২৬ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৮৬৫ জন, যার মধ্যে পাস করেছে ৮৪৯ জন এবং গড় পাসের হার ৯৮.১৬ শতাংশ। এই কেন্দ্রে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫৭ জন, যা পাস করা শিক্ষার্থীর সাপেক্ষে ৪২.০৪ শতাংশ। অন্যদিকে, গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৬০৬ জন, পাস করেছে ১৪০৫ জন এবং গড় পাসের হার ৮৭.৪৯ শতাংশ। এই কেন্দ্রে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১৪৪ জন, যা পাস করা শিক্ষার্থীর সাপেক্ষে মাত্র ১০.২৪ শতাংশ। অর্থাৎ, এই দুই কেন্দ্রের পাশের হারের ব্যবধান ১০.৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ব্যবধান ৩১.০৮ শতাংশ।

প্রশ্ন ওঠে, একই জেলায় অবস্থিত দুটি ভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফলে এত বড় ব্যবধান কেন? বিশেষ করে জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এই ফারাক কেন দেখা গেল? এর নেপথ্য কারণ কী? এটি কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো গলদ রয়েছে? গাজীপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্র নিয়ে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ না থাকলেও ধলাদিয়া কলেজ কেন্দ্র নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। শুধু এই দুটি কেন্দ্রই নয়, গাজীপুরসহ সারাদেশের বহু কেন্দ্রে এ ধরনের ফলাফলবৈষম্য খুঁজে পাওয়া যাবে।

পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণে লবিং ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু কেন্দ্রে নামমাত্র তদারকি চলে, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ ঘটে এবং কক্ষের ভেতরে অসদুপায় অবলম্বন করলেও পরিদর্শকরা দেখেও না দেখার ভান করেন। এমন শিথিল পরিবেশে পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা পরীক্ষার্থীরাও অস্বাভাবিক ভালো ফলাফল করতে পারে, অথচ কঠোর তদারকির কেন্দ্রে ফল প্রকৃত প্রস্তুতির প্রতিফলন ঘটায়। কোনো প্রতিষ্ঠান নিবেদিতপ্রাণ পাঠদান ও কঠোর পরিশ্রমের জোরেও ভালো ফল অর্জন করতে পারে, তবে অস্বাভাবিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তি এবং অতিদ্রুত ফলাফল পাল্টে যাওয়ার ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করে। আশার কথা হলো, সরকার এ বছর পূর্বের বছরের তুলনায় কেন্দ্রভিত্তিক নজরদারি কিছুটা কড়া করেছে এবং কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে প্রতিটি কেন্দ্রে এই নজরদারি সমভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে; বিশেষ করে অনেক কেন্দ্র নিয়ে খোদ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকেই অভিযোগ উঠেছে। তাই সরকারের কেন্দ্রভিত্তিক নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো মূলত কেন্দ্রের ভেতরের নকল ঠেকানো ও নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থী কোন কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবে, সেই কেন্দ্র নির্ধারণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ করার কোনো নতুন সিদ্ধান্ত বা কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। সিসিটিভি ফুটেজ আদৌ কেউ নিয়মিত যাচাই করছে কি না, যাচাইয়ে কতটি অনিয়ম ধরা পড়েছে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—সেই তথ্যও সাধারণ মানুষের অজানা।

ফলাফলবৈষম্যের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো অবকাঠামোগত বৈষম্য, শিক্ষকসংকট ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পার্থক্য। শহরের অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের কোনো কমতি নেই, অথচ মফস্বলের বহু কলেজ আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জামের অভাবে ধুঁকছে। অনেক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বিষয়ের শিক্ষকই নেই; অনেক ক্ষেত্রে এক বিষয়ের শিক্ষককে বাধ্য হয়ে অন্য বিষয় পড়াতে হয়। এতে বেশিরভাগক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি থেকে যায়। জাতীয় দৈনিকগুলোর এইচএসসি ফল বিশ্লেষণেও শহর ও মফস্বলের শিক্ষাব্যবস্থার এই পার্থক্যের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। পাশাপাশি, উত্তরপত্র মূল্যায়নেও বৈষম্যের প্রশ্ন রয়েছে; যেখানে কোথাও উদার হাতে নম্বর দেওয়া হয়, আবার কোথাও অতিরিক্ত কড়াকড়ি করা হয়। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

তাছাড়া, ফলাফলকে প্রচারের বাণিজ্যিক হাতিয়ার বানানো বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা। আজকাল অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালো ফলকে তাদের বিজ্ঞাপনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ফল যত চাকচিক্যময় ও জিপিএ-৫ এ ভরপুর হবে, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির চাহিদা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। এই বাণিজ্যিক মানসিকতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেকোনো মূল্যে ভালো ফল দেখানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয় এবং তখনই অনিয়মের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তদবির করে যেকোনো মূল্যে সুবিধাজনক কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এর নির্মম মূল্য দিতে হয় সেইসব প্রতিষ্ঠানকে, যেগুলো সততা ও ন্যায্যতার সাথে নিজেদের স্বাভাবিক প্রস্তুতি নিয়ে ভালো ফলাফল করার চেষ্টা করে।

এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেবল ফলাফলের গাণিতিক গড় দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান মাপা যায় না। কোথাও শতভাগ পাস এবং কোথাও শতভাগ ফেল— এই দুই মেরুর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণগুলো আলাদাভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। সরকার কেন্দ্রের ভেতরে নজরদারি বাড়িয়েছে, এখন প্রয়োজন সেই নজরদারির ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং কেন্দ্র নির্ধারণ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করা। এই সংকট সমাধানের জন্য জরুরি যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে: কেন্দ্র নির্ধারণে ডিজিটাল ও দ্বৈবচয়ন পদ্ধতি প্রবর্তন এবং এর স্পষ্ট মানদণ্ড জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা; শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের পাশাপাশি কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করা, যাতে ফলাফলগুলোর অস্বাভাবিক ব্যবধান নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যায়; সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত যাচাইয়ের ফলাফল, ধরাপড়া অনিয়মের সংখ্যা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে গৃহিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করা; উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও মডারেশনে অভিন্ন মানদণ্ড নিশ্চিত করা, খাতা মূলয়নকারীদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রকাশ করা; যেসব কেন্দ্র নিয়ে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা; যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল এসেছে, সেখানে হুট করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে শিক্ষক সংকট দূরীকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করা।

আদতে, মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই একটি বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আর সেই মূল্যায়নের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হতে হবে এমন এক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে পরীক্ষার ভালো ফল দেখে মানুষের মনে সন্দেহ নয়, বরং আস্থার অনুভূতি জাগে।

লেখক: কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইমেইল: [email protected]