বৃহস্পতিবার

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪ কার্তিক, ১৪৩৩

ফ্যাক্ট চেকিং: একচেটিয়া বয়ানব্যবসায় লাগাম

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৫৯

শেয়ার

ফ্যাক্ট চেকিং: একচেটিয়া বয়ানব্যবসায় লাগাম
ছবি: নিয়ন মতিয়ুল

মানুষের আদিম প্রবণতাই হলো ‘কমফোর্ড জোনে’ আটকে থাকা। এমনকি ‘অন্ধবিশ্বাসে’ ডুবে থাকার মোহগ্রস্ততাও। এর ওপর যদি কয়েকশ’ বছরের দাসত্বের স্মৃতি বহনকারী মস্তিষ্ক হয়, তাহলে তো আরও বেশি ক্যালরি খরচ করে পরিবর্তনশীল তথ্যের ঝুঁকি নেওয়ার শক্তিই থাকে না। যে কারণে, পরিচিত ধারণা, নিজের বিশ্বাস আর মতের সঙ্গে মেলে-চিন্তার পরিশ্রম এড়িয়ে এমন তথ্যের প্রতি তার ঝোঁক বাড়ে।

মনস্তত্বের এই প্রবণতার কারণেই সামনে আসা কোনো নতুন তথ্য বা তত্ত্ব যখন পুরোনো বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সেই তথ্য যাচাই করার বদলে মানুষ তথ্যদাতার পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান বিচার করতে শুরু করে। তথ্যব্যবসায় জড়িত নিউজমিডিয়ায় তখন খবর শুধুই তথ্য থাকে না; হয়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট বয়ান তৈরির উপকরণ।

তথ্য বা নিউজ সিলেকশন, হেডিং, ট্রিটমেন্ট, নিউজ কিল করা—সবকিছু দিয়েই নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দেওয়া যায় পাঠককে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে রাজনৈতিক ন্যারেটিভের পক্ষে তথ্য সাজানোই বড় হয়ে ওঠে। আর এভাবেই সাংবাদিকতায় আদর্শের মুখোশে দলীয় আনুগত্য তথ্যের ব্যবসায় পরিণত হয়। ফলে একই ঘটনা প্রিন্ট ও প্রচলিত নিউজমিডিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন বয়ানে হাজির হতে পারে।

এক্ষেত্রে ডিজিটাল মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে ‘ফ্যাক্ট চেকিং’। যা শুধুই কনটেন্টের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিউজমিডিয়ার নিজস্ব ন্যারেটিভকেও প্রশ্নের মুখে নিয়ে আসা। মিডিয়া যা বলছে, তার পক্ষে প্রমাণ কী, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ঠিক আছে কিনা, তথ্যটি আংশিক, বিভ্রান্তিকর, নাকি সরাসরি মিথ্যা, প্রভাবশালী ব্যক্তি-গোষ্ঠী কিংবা অতি জনপ্রিয় নিউজ মিডিয়ার দাবিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে কিনা—সেসব যাচাই করা।

এ বিচারে ফ্যাক্ট চেকিং অতি জনপ্রিয় বা প্রভাবশালী নিউজ মিডিয়ার জন্য অস্বস্তিকর হলেও পাঠকের কাছে তাদের আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার জন্যও জরুরি। তবে বিপদটা হচ্ছে, ফ্যাক্ট চেকিংও যদি পক্ষপাতিত্বের হয়, পুরোনো বাইনারি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রমোট করে, তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই। সেক্ষেত্রে ইনটেনশন ছাড়া, নির্মোহ, প্রকৃত ফ্যাক্ট চেকিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা টিকে থাকতে পারে তার পদ্ধতি, প্রমাণ, ধারাবাহিকতা, নির্মোহ রাজনৈতিক পরিচয়ের মানদণ্ডে।

বলা ভালো, দেশীয় নিউজমিডিয়ার সবচেয়ে বড় সংকট কিন্তু যাচাইবিহীন মিথ্যা তথ্য নয়; বরং নিজস্ব বিশ্বাসকে তথ্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। যাদের নিজের পক্ষের ভুল চোখে পড়ে না, নিজের রাজনৈতিক ধারণাকে প্রশ্নাতীত মনে করেন, তারাই নিউজমিডিয়ার ‘ক্যানসার’। এমনকি যেসব পাঠক যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিজের পছন্দের ন্যারেটিভকে সত্য হিসেবে নেন, তারাও সমস্যার বড় অংশ।

তাই ফ্যাক্ট চেকিং শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, জাপা, বাম-ডান, অতিবাম, অতিডান, অভিজাত, প্রান্তিকের জন্যই নয়, নিউজমিডিয়ার জন্যও জরুরি। হোক সেটা মেগা, মাঝারি, মিনি, অতি জনপ্রিয়, বিকল্প মিডিয়া। সেটা যে পক্ষের, মতাদর্শের, তথ্যেরই হোক না কেন, যাচাইয়ের মানদণ্ড যেন হয় অভিন্ন, নির্মোহ।

ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কাজ পুরোনোর জায়গায় নতুন কোনো ন্যারেটিভ বা মতাদর্শকে বসানো নয়, বরং সত্য তথ্যের দাবিকে প্রমাণের মুখোমুখি করা, যেকোনো ন্যারেটিভকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার প্রচেষ্টা। মতাদর্শ বা ন্যারেটিভের ভারে ঝিমিয়ে পড়া, পঙ্গু নিউজমিডিয়াকে সচল করতে হলে অনবরত প্রশ্নের মুখে রাখার বিকল্প নেই। সত্যের পক্ষে আছি, প্রমাণ ছাড়া এমন দাবিও নিউজমিডিয়ার যথেষ্ট নয়। ফ্যাক্ট চেকিং সেই প্রমাণ হাজির করার সক্ষমতা রাখে। নিয়ন মতিয়ুল, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ