বাংলাদেশে সাড়ম্বরে উদযাপিত হলো সনাতনীদের দুর্গাপূজা। দেশের ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে এই পূজা-অর্চনা চলে। বড় কোনো সহিংসতা ছাড়াই পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে সনাতনীরা তাদের দুর্গোৎসব উৎসবের আমেজে নির্বিঘ্নে পালন করেছে। এবারের পূজায় নিরাপত্তা রক্ষায় পূজামণ্ডপগুলোতে বিপুল পরিমাণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রতিমা বিসর্জন শেষে সনাতনীদের প্রায় সবাই স্বীকার করেছেন যে, এবার দুর্গাপূজা উদযাপনে তারা আগেরবারের তুলনায় বেশি নিরাপত্তা পেয়েছে। কেউ তাদের পূজা উদযাপনে বাধা দেয়নি। তাছাড়া ভারতীয় সনাতনী নাগরিকদের অনেককে বাংলাদেশে এসে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও পূজায় অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। তারা মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। তাদের অনেকে বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বেশ ভালো আছেন। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমরা তাদের ধর্মপালনে বাধা দিচ্ছে না। বাংলাদেশে এবার দুর্গোৎসবের পর চিহ্নিত ভারতঘেঁষা সাংবাদিকরাও স্বীকার করেছেন যে, এবারের পূজা তারা আগের চেয়ে ভালোভাবে করেছে; বরাদ্দও বেশি পেয়েছে সরকার থেকে। দৈনিক কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা পর্যন্ত স্বীকার করেছেন এ কথা। তিনি বলেছেন, "এবার সারা বাংলাদেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে, সুন্দর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।" এ সময় তিনি পূজায় বরাদ্দ বেশি থাকা ও সরকারি ছুটি বেশি থাকার কথাও উল্লেখ করেন। শুধু দেশের ভেতরে নয়, ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী লোকেরাও এ কথা স্বীকার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের কথাই ধরা যাক। তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, হিন্দুরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা পেয়ে এবার দুর্গোৎসব পালন করেছে। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পুজো এবার চমকে দেওয়ার মতো। সাবাশ বাংলাদেশ!’ অথচ বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বারবার বলা হতো যে, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলের চেয়ে হিন্দুরা এখন বেশি নিরাপদে আছে—সেটি প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য হিন্দুদের মিথ্যা ভয় দেখাত, আষাঢ়ে গল্প শোনাত। সনাতনীরাও সেটা বিশ্বাস করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কায়েমে সহযোগিতা করেছিল। এবারের দুর্গোৎসব পালনের পর আশা করি তাদের ভুল ভেঙেছে এবং আওয়ামী লীগের প্রতারণা তারা বুঝতে পেরেছে।
যাইহোক, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের যখন এই অবস্থা, তখন ভারতের সংখ্যালঘুদের খবর কী? কেমন আছে তারা? সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিমরা কি স্বাধীনভাবে ধর্মপালন ও জীবনযাপন করতে পারছে? গণমাধ্যমের বরাতে আমরা নিয়মিত দেখি ভারতে মুসলিম নির্যাতনের অমানবিক চিত্র। সেখানে বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে। আসামে বহু মুসলিমের ঘরবাড়ি ভেঙে ও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মাত্র দুই দিনেই আসাম রাজ্যের নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাটের ১১০০টির বেশি মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ওঠেছে ১০টির বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলার। অসহায় নারী ও শিশুরা আহাজারি করছে; চোখের সামনে জ্বলছে তাদের ঘরবাড়ি ও সাজানো সংসার। ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এরকম হামলা, গণপিটুনি এবং সামাজিক বয়কটের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। 'গরু রক্ষা' বা 'লাভ জিহাদ'-এর মতো মনগড়া ইস্যুকে সামনে রেখে প্রতিনিয়ত মুসলিম তরুণ ও পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়ার অজুহাতে, কখনো ফ্রিজে রাখার অজুহাতে, কিংবা বিক্রির অজুহাতে মুসলিমদের পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে। ভারতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে চলছে 'বুলডোজার জাস্টিস'—অর্থাৎ যেকোনো ঘটনা বা সহিংসতার পর কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই অভিযুক্তের (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুসলিম) ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও দিল্লিতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে, যা বিচারব্যবস্থা ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর গুরুতর আঘাত। ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদকে টার্গেট করা হচ্ছে। ৬০০ বছরের পুরোনো শাহী মসজিদ ভাঙা নিয়ে সংঘর্ষ কিংবা ৮০০ বছরের পুরোনো আখুনজি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত হানার মাধ্যমে তাদের ধর্মপালনে গুরুতর বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ভারত শুধু মুসলিমদের স্থাপনা ধ্বংসই করছে না, তাদের দৈনন্দিন ধর্মপালনেও বাধা সৃষ্টি করছে। প্রকাশ্যে বা খোলা মাঠে শুক্রবারের জুমার নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও মুসলিমদের হেনস্থা করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হচ্ছে। লাউডস্পিকারে আজান দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে আইনি কড়াকড়ি ও জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। ধর্মান্তরবিরোধী আইন এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কার্যকর করার মাধ্যমে মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার ও নাগরিকত্বকে ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে; মুসলিমদের পরিকল্পিতভাবে নাগরিকত্বহীন করার অপচেষ্টা চলছে। মুসলিমদের 'অনুপ্রবেশকারী' কিংবা 'বেশি সন্তান জন্মদানকারী' আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে আক্রমণ করা হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের The State of the World's Human Rights (April 2026) শিরোনামের প্রতিবেদনে ভারতে মুসলিমসহ সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে: ভারতে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন আরও তীব্র হয়েছে; বিশেষ করে লাভ জিহাদ ঠেকানোর নামে বিয়েসংক্রান্ত বৈষম্যমূলক আইনের মাধ্যমে মুসলমানদের টার্গেট করা হয়েছে। আসাম রাজ্যে গণ-উচ্ছেদের কারণে হাজার হাজার মুসলমান গৃহহীন হয়ে পড়েছেন এবং মহারাষ্ট্র ও জম্মু-কাশ্মীরে মুসলমানদের বাড়িঘর ভাঙচুর অব্যাহত রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিনা নোটিশে কিংবা ২৪ ঘণ্টার নোটিশে ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। রোহিঙ্গা ও বাঙালি-বংশোদ্ভূত মুসলমানদের অবৈধভাবে পুশ-ব্যাক করা হচ্ছে, আর নতুন অভিবাসন নিয়মের কারণে আশ্রয়প্রার্থীরা তাদের আইনি সুরক্ষা হারিয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর World Report 2026-এ ভারতের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে বলা হয়েছে: হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ভারতের কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়া অব্যাহত রয়েছে; সেই সাথে মুসলমান এবং সরকার-সমালোচকদের প্রতি বিদ্বেষ প্রচার আরও বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ তথাকথিত 'অবৈধ অভিবাসী' দাবি করে ভারতীয় নাগরিকসহ শত শত বাংলাভাষী মুসলমান ও রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে বিতাড়িত করেছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে: ভারতে মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা বেড়েছে ও বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমরা হিন্দুদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
মার্কিন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশন (USCIRF) Annual Report 2026-এ ভারতকে Country of Particular Concern (CPC) বা বিশেষ উদ্বেগের দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের দায়ে এবং তা সহ্য করার অপরাধে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র' ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস এবং জড়িত ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও বলেছে। কমিশনটি তাদের প্রতিবেদনে মসজিদ ভাঙচুর, ওয়াকফ আইন সংশোধনের মাধ্যমে মুসলিম সম্পত্তির অধিকার সংকুচিত করা, গরু জবাই নিষিদ্ধকরণসহ বিভিন্ন নিপীড়নের কথা উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির দিকে তাকালে কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে: রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা, আইনি ব্যবস্থা ও মৌলিক ধর্মীয় অধিকার। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্র ও সাধারণ সমাজ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাতে রাষ্ট্রের কোনো সায় থাকে না। যেকোনো সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়। কিন্তু ভারতে রাষ্ট্রীয় মদতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি, আরএসএসসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর দ্বারা মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হচ্ছে। তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতে দেখা যায়; এমনকি উল্টো ভুক্তভোগীদের ওপর মামলা চাপানোর অভিযোগ রয়েছে। ভারতে সংখ্যালঘুরা আইনি সুরক্ষার চেয়ে নীতিগত নিপীড়নের বেশি শিকার হচ্ছে। ধর্মীয় মৌলিক অধিকারের কথা বলতে গেলে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো তাদের উৎসব ও পূজা-অর্চনা নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে। কিন্তু ভারতে ধর্মীয় পোশাক হিজাব থেকে শুরু করে গরুর মাংস খাওয়া, নামাজ পড়া, আজান দেয়া—সবক্ষেত্রেই কড়াকড়ি ও আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে ভারত এ বিষয়ে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে না। মুসলিমসহ সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা দিচ্ছে না। বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিমদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে।
ভারতে যখন সংখ্যালঘু মুসলিমরা এভাবে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং নিজেদের ধর্মপালনে নানাবিধ বাধার মুখোমুখি হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা সম্পূর্ণ নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করছে। অথচ এই বাস্তবতাকে উড়িয়ে দিয়ে ভারত ও তার গদি মিডিয়া দিন-রাত বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করে— যা এক চরম মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়। যে দেশ নিজের ভূখণ্ডে সংখ্যালঘুদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, অন্য কোনো দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার সামান্যতম নৈতিক ভিত্তিও কি তাদের আছে? ভারতের উচিত বাংলাদেশ নিয়ে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ও মিথ্যাচার বন্ধ করে নিজেদের দেশের মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। তারা কি এই দ্বিমুখী নীতি ও হিপোক্রেসি থেকে বেরিয়ে আসবে, নাকি এই অন্ধ বৃত্তেই আটকে থাকবে?
লেখক: কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন:







