ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আমার এক ধরণের টান ছিল। তবে মাস্টার্স শেষ করার পর পেশাগত জীবন শুরু করি একটি এমপিওভুক্ত কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তীতে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই। বহু আবেদনকারীর মধ্য থেকে আমার মতো একজন শিক্ষককে বেছে নেওয়ার পেছনে সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের মূল যুক্তি ছিল—একজন শিক্ষক হিসেবে পেশাগত সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখা সহজ এবং সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই। সেসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকদেরই জেলা প্রতিনিধি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।
তখনকার কর্মপদ্ধতি ছিল ভিন্ন। শিক্ষকেরা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন শেষে অবসর সময়ে খবর ও ছবি ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠাতেন। পরে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে সাথে ফোন বা ফ্যাক্সে সংবাদ পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়, যার ফলে আগের দিনের খবর পরদিনের পত্রিকায় ছাপা হতো। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পাঠদান ও শিক্ষকের মূল দায়িত্বে কোনো ব্যাঘাত ঘটত না।
তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। শিক্ষকদের (সরকারি, বেসরকারি, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত) বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে নতুন শিক্ষাক্রম ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তাল মেলাতে শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময় উপস্থিত থাকা ও মনোনিবেশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।
কিন্থ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিক্ষক ও কর্মচারী ব্যাপকভাবে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। যেহেতু বিদ্যমান কোনো আইনে বা নীতিমালায় শিক্ষকদের সাংবাদিকতা করার ওপর সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি-নিষেধ নেই, তাই অনেকে দাবি করেন যে তারা অবসর সময়ে এই কাজ করছেন। আইনগত বাধা না থাকলেও, যেকোনো চাকরির ক্ষেত্রে নিজস্ব পেশাগত শৃঙ্খলা ও কিছু নৈতিক নিয়মকানুন (ঝবৎারপব জঁষবং) থেকে যায়—শিক্ষকতা পেশাও এর ব্যতিক্রম নয়। একজন শিক্ষক যখন মাস শেষে সরকারি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা গ্রহণ করছেন, তখন নিজের মূল কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বা ফাঁকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, অতীতে যখন শিক্ষকেরা সাংবাদিকতা করেছেন, তখন কি কাজের ব্যাঘাত ঘটেনি? সত্য হলো—তখনকার এবং বর্তমানের সাংবাদিকতার ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানে প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইউটিউব চ্যানেল, আইপি টিভি এবং পত্রিকার অনলাইন/মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এখন সংবাদ পরিবেশনে প্রতি মুহূর্তে আপডেটের প্রতিযোগিতা চলে। শুধু তথ্য সংগ্রহই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষকদের ভিডিও ধারণ, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং সরাসরি খবর সম্প্রচারে অংশ নিতে হয়। এর ফলে একজন সাংবাদিকশিক্ষককে প্রতিনিয়ত খবরের পিছে ছুটতে হয় এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে হয়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন রেখে দৌড়াদৌড়ি করা ছাড়া উপায় থাকে না, যা প্রত্যক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ঘটনা এখানেই থেমে নেই; অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই দ্বৈত পেশায় জড়িত অনেকেই শিক্ষক পরিচয়ের চেয়ে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়টি প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় কিছু অস্বচ্ছ বা অনিয়মে জড়ানো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও পরিচালনা পর্ষদও তাদের সমীহ করে চলেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, এই প্রভাবশালী পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে না যাওয়া, অসময়ে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করা কিংবা নিয়মিত অনুপস্থিত থাকার মতো অনিয়ম ঘটে চলেছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা অনেক সময় ভয় বা প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কায় প্রতিবাদ করতে পারেন না। কোনো সাহসি প্রতিষ্ঠানপ্রধান যদি এই অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চান, তবে তাকে উল্টো নানা হয়রানি ও অপপ্রচারের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয় এবং শিক্ষার পরিবেশ জিম্মি হয়ে পড়ে।
শিক্ষকেরা যদি নিছক কলামিস্ট, বিশ্লেষণাত্মক লেখক বা গবেষক হিসেবে সংবাদমাধ্যমে অবদান রাখেন, তবে তা প্রশংসনীয়। কিন্থ শিক্ষকতার সময় চুরি করে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও বাইক নিয়ে সংবাদ সংগ্রাহক হিসেবে দৌড়াদৌড়ি করা কোনো সুস্থ ব্যবস্থা হতে পারে না। মফস্বল অঞ্চলগুলোতে এই প্রবণতা ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। শিক্ষকতা একটি মহান এবং পূর্ণকালীন দায়িত্ব। শিক্ষাক্ষেত্রকে বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত রাখতে হলে একজন ব্যক্তিকে হয় পূর্ণকালীন শিক্ষকতা, নয়তো পূর্ণকালীন সাংবাদিকতা—যেকোনো একটিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা ও আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। লেখক: সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্কাই এবং কনসালট্যান্ট এডিটর, দ্য ডেইলি ইন্ডাস্ট্রি।
আরও পড়ুন:







