রবিবার

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০ কার্তিক, ১৪৩৩

দাম্ভিক-বদমেজাজিরাও যখন ‘দেশবরেণ্য’

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৭

আপডেট: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৯

শেয়ার

দাম্ভিক-বদমেজাজিরাও যখন ‘দেশবরেণ্য’
ছবি: নিয়ন মতিয়ুল

বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। এক তরুণের ইচ্ছা সাংবাদিক হবেন। পিআইবিতে মিডিয়া ফেলোশিপ করতে চান। সেজন্য দরকার বড় সাংবাদিকের সুপারিশ। গেলেন জাতীয় প্রেসক্লাবে, নিজ এলাকার প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতার কাছে। আবেদন জানাতেই নেতা গর্জে উঠলেন, “তোমাকে তো চিনি না! কেন সুপারিশ দিব? চলে যাও!

নামকরা সাংবাদিকের এমন দুর্ব্যবহারে তরুণটি ভেঙে পড়েছিলেন। কারণ, তাকে এলাকার ভোটে জেতাতে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন সেই তরুণ। তাই তার ভেতরে জেদ চেপে বসল। যে কারণে সেই তরুণ এখন ঢাকায় সাংবাদিকতা করছেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেই নেতার মৃত্যুর খবর তার হাতেই প্রথম লেখা ও প্রকাশ হলো।

সেই বড় সাংবাদিকের মৃত্যুর পর অনেকে গভীর শোক প্রকাশ করছেন, গুণীজনের বিদায়ে সাংবাদিকতায় শূন্যতা তৈরি হওয়ার বিষয়টিও সামনে আনছেন। তবে দুঃখজনক ঘটনা, নিজ এলাকার অনেকেই নেতার তীব্র সমালোচনা করছেন। জীবিতকালে তার দুর্ব্যবহার, দাম্ভিকতার দিকটা সামনে আনছেন।

২. কিছুদিন আগের কথা। এক সহকর্মী গেছেন তার পুরোনো অফিসে। নতুন নির্বাহীর সঙ্গে পরিচয় হতে। তার রুমে ঢুকতেই পড়লেন বিপাকে। নির্বাহী গর্জন উঠলেন, “এই কে তুমি? অনুমতি না নিয়েই ঢুকে পড়েছো? বের হও, বের হও!”বাজখাই গলায় অফিস সহকারীকে ডেকে ধমক দিলেন।

ঘটনায় আকস্মিকতা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সেই সহকর্মী।

অফিস সহকারী যতই বলার চেষ্টা করল, সাবেক কলিক, আপনার সঙ্গে পরিচয় হতে এসেছেন। একথা শুনে আরও ফায়ার হলেন নির্বাহী। গজগজ করতে করতে বললেন, “কোত্থেকে আসে এসব!” ভীষণ মন খারাপ করলেন সেই সহকর্মী। শুনেছিলেন, সেই ভদ্রলোক এক সময় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাজ করতেন। কিন্তু এমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতায় শপথ নিলেন হৃদয়ের যত টানই থাকুক, ওই অফিসে আর ঢুকবেন না কখনও।

আরেক ‘দেশবরেণ্য’ সাংবাদিককে দেখছি খুব কাছ থেকে। তার দুর্ব্যবহার, দাম্ভিকতায় সবাই ভয়ে কাঁপতো। কি মিটিং, কি নিউজরুম-সবার সামনেই নিউজ এডিটর, চিফ রিপোর্টারকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতেন। কারণে-অকারণে যাকে তাকে অপদস্ত করতেন। তার সেই ভয়ঙ্কর আচরণে বেশিরভাগ কর্মীই হয়ে গেছেন হাইপারটেনশনের রোগী। কোনো ইভেন্টের জন্য বিভাগ, জেলা প্রতিনিধিদের কাছে চাঁদাবাজিও করতেন। অথচ বিস্ময়কর হচ্ছে, জনপরিসরে, মিডিয়া কাভারেজ তিনি রীতিমতো ‘দেশবরেণ্য’ খেতাব পেতেন।

৩. সত্যিই কিছু সিনিয়র আছেন, বাজারে তারা স্টার সাংবাদিক, অথচ ভেতরে ভেতরে ভীষণ গোলমেলে। স্বভাব একদম “রতনে রতন চেনে” মডেলের। শুধু নিজের পক্ষে অন্ধ থাকার কারণেই তারা অযোগ্য-অপদার্থদের পাশে বসান, নেতৃত্ব আর কর্তৃত্বও দেন। শুধুমাত্র ‘সহমত ভাই’ বা পক্ষের লোক না হওয়ার কারণে দারুণ মেধাবী, স্মার্ট, সৃজনশীলশীলদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন। উঠতে বসতে অপমান করার চেষ্টা করেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো সাংবাদিক যখন বিশেষ দলের হয়ে কাজ করেন, তখন তার ব্যক্তিগত আচরণ কি সত্যিই উপেক্ষিত হতে পারে? সাংবাদিকতায় দশকের পর দশক ধরে “আমরা বনাম তোমরা”, “স্বপক্ষ বনাম প্রতিপক্ষ” মডেল পুরোপুরিই ঐতিহ্য (ট্যাবু) হয়ে উঠেছে। যা সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড ক্ষয়ে দিয়েছে। ফলে ভয়ঙ্কর দাম্ভিক, নার্সিসিস্ট, বদমেজাজি, অপদস্তকারী অনেক সাংবাদিকও ‘গুণীজন’, ‘দেশবরেণ্য’ হিসেবে খেতাপ পেয়ে যান, সমাদৃত হন। নিয়ন মতিয়ুল, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ