সোমবার

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪ কার্তিক, ১৪৩৩

সাংবাদিকতা কি রেস, নাকি মিশন!

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:১৫

শেয়ার

সাংবাদিকতা কি রেস, নাকি মিশন!
নিয়ন মতিয়ুল

ব্রেকিং নিউজ হিসেবে রাত দশটার দিকে খবরটি দেয় প্রথম আলো। সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাতে সেই নিউজটি ডজনখানেক মিডিয়াও লিড করে। তাৎক্ষণিক সেই খবর-লিংক শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন।

তবে রাত পৌনে ১১টার দিকে সেই খবরকে “সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে তীব্র প্রতিবাদ জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা। ঠিক সেই প্রতিবাদের পরই ইশরাকের পক্ষের হয়ে অনেকে প্রথম আলোকে তীব্র কটাক্ষ করতে থাকেন। ইশরাকের ফেসবুকও নির্ঘুম রাত কাটায়।

রাষ্ট্রায়ত্ত চ্যানেল বিটিভিও খবরটি নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা তৈরি করে। তবে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিমন্ত্রী পোস্টে জানালেন, তিনি “দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা” দেবেন। তার পক্ষের লোকজন পোস্ট দিলেন, “ইশরাকের ওপর দিয়ে সংঘবদ্ধ মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে গেল”। অনেকে ঘটনাকে “লঘু পাপে গুরুদণ্ড” বলছেন। যেখানে ‘সহমত’ জানাচ্ছেন অনেক সংবাদকর্মীও।

টকশোর এক চেনা তরুণ রাত তিনটায় লিখলেন, ইশরাককে ভিলেন বানানো হচ্ছে। যার জন্য বড়জোর শোকজ হতে পারে সেখানে পদত্যাগের বয়ান সব মিডিয়াতে প্রচার হচ্ছে ব্যাপকভাবে। গুপ্ত সুশীলরা ধুমায়ে তারেক রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে ভাসায়ে ফেলতেছে। শেষ অবধি প্রথম আলোর ব্রেকিং নিউজের সেই রিপোর্টার মোহাম্মদ মোস্তফা (মানিক ভাই) বেলা পৌনে ১১টায় লিখলেন, “সন্দেহ থাকতেই পারে, প্রশ্ন তোলাও স্বাভাবিক। তবে শেষ পর্যন্ত তথ্যই কথা বলে। রাত পোহাতেই সেই সংশয়ের জবাব দিলেন ইশরাক হোসেন নিজেই।”

২. প্রশ্ন হচ্ছে, ইশরাককে কি সত্যিই ভিলেন বানানোর ‘রেসে’ নেমেছে মিডিয়া? নাকি “লঘু পাপে গুরুদণ্ড” নিশ্চিত করার মিশনে নেমেছে? বলা ভালো, এসবের উত্তর যেমন অপেক্ষিক তেমনি জটিলও। কারণ, কয়েক দশক ধরেই পছন্দের রাজনৈতিক বয়ান তৈরির রেসে ছিল বহু মিডিয়া। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের মিশনও চালিয়েছে বেপরোয়াভাবে। ফলে মিডিয়াকে এখন সার্বক্ষণিক প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষেই সত্যিকারের মিডিয়ার ‘রেস’ আর ‘মিশন’ দুটোই থাকা জরুরি। কারণ, শুধু সাধারণ মানুষই নয়, অনেক সময় জনপ্রতিনিধি, আইনপ্রণেতা এমনকি মন্ত্রীরা পর্যন্ত ‘হয় জেনে অথবা না জেনে’ তাদের আচরণ, কর্মকাণ্ড বা বক্তব্যের আইনি সীমা লঙ্ঘন করে থাকেন। সেটা সব সরকারের সময়েই দেখা গেছে। সেক্ষেত্রে সেই আইনি সীমা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই মিডিয়ার কাজ।

আইন বা সংবিধান ধরা বা ছোঁয়া যায় না- তাই এটা শুধুই প্রয়োগিক বাস্তবতা। আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে কোনো মন্ত্রীর মাদকবিরোধী অভিযানে নামা আইন সমর্থন করে না। একইভাবে “সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য শিক্ষা” বলাটা দায়িত্ব এড়ানোসহ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব প্রকাশ করে। আবার “আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা থাকবে না” এমন বক্তব্য বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ফ্যান্টাসি তৈরি করে শুধু। তবে স্মরণ রাখা দরকার, এসব বিষয় মিডিয়ায় বেশি হাইলাইটেড হলে বাইনারি দৃষ্টিভঙ্গিও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।

৩. মিডিয়ার ‘রেস’ আর ‘মিশন’ তখনই সর্বজনীনতা পায় যখন তা শুধুই জনস্বার্থের উদ্দেশে ঘটে। প্রকৃতপক্ষে মিডিয়ার কাজের ধরনই এমন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মিডিয়া সম্মিলিত মিশন শুরু করলে সেটা রেসে বদলে যায়। যতক্ষণ না সব দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সেই রেস চলতে পারে। ঠিক একইভাবে জনস্বার্থবিরোধী ট্যাবু ভাঙতে হলে মিডিয়াকে বেপরোয়া রেসে নামতেই হয়।

তবে জনস্বার্থের পক্ষে মিডিয়ার ‘মিশন’ বা ‘রেস’ কোনোভাবেই ক্ষমতাসীনরা সুনজরে দেখে না। আইন পরিবর্তন করে হলেও তারা মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। বিগত সরকারের সময়ে ভিন্নমতকে দমন করার চেষ্টা করা হয় প্রচলিত আইনে নতুন নতুন ধারা যুক্ত করে। তখন যেসব মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সরকারের সেই আইন তৈরিতে বিরোধিতা থেকে সরে এসেছিলেন তাদের অনেকের অভিজ্ঞতা খুবই অপ্রীতিকর।

অনেকের অভিমত, মিডিয়া যদি ‘গদিপ্রেমী’ না হয়ে রাষ্ট্র, সরকার আর সমাজের গভীরে স্থির হওয়া অনিয়ম, দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সম্মিলিতভাবে মাঠে নামে সেটাই হবে আসল মিশন। সেই মিশনের বেপরোয়া রেসেই গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সংকটের কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব।

সেই সর্বজনীন মিশন শুরু করলে মিডিয়া নিয়ে বাইনারি দৃষ্টিভঙ্গির আগ্রাসী আচরণও আর থাকবে না। কোনো রাজনৈতিক দল-মত-গোষ্ঠী-সম্প্রদায় নয়, মিডিয়ার একমাত্র গাইড শুধুই সংবিধানিক আইন। যা নিশ্চিত করতে পারলেই মিডিয়া ঘিরে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মেঘ সরে যেতে বাধ্য।

নিয়ন মতিয়ুল, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ