বিদেশের মাটিতে রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন লাখো প্রবাসী। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়, পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে তাঁদের অভিজ্ঞতা কেমন হচ্ছে, সেটি নিছক যাত্রীসেবার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সেবার মানের সঙ্গেও যুক্ত। প্রবাসীরা দেশে ফেরেন পরিবার-পরিজনের কাছে। কেউ দীর্ঘদিন পর সন্তান ও মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, কেউ নিজের সঞ্চয় দিয়ে বাড়ি নির্মাণ বা ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে ফেরেন। আবার হাজারো মানুষ নতুন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। তাঁদের সবার জন্য বিমানবন্দর হওয়া উচিত নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, দ্রুত ও মানবিক সেবার জায়গা। কিন্তু বাস্তবে বিমানবন্দরের সেবা নিয়ে প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এসব অভিযোগের সবগুলো একই মাত্রায় সত্য বা প্রমাণিত–এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি এবং কিছু ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের জন্য বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
বিমানবন্দরে নিরাপত্তা তল্লাশি, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস পরীক্ষা আন্তর্জাতিক বিমানযাত্রার স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ। নিরাপত্তার স্বার্থে এসব প্রক্রিয়ায় সময় লাগতেই পারে। তবে যাত্রীদের একটি অংশের অভিযোগ, কখনো কখনো এসব প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সময় লাগে কিংবা একই ধরনের তথ্য ও কাগজপত্র একাধিক ধাপে উপস্থাপন করতে হয়। কেউ কেউ অতিরিক্ত তল্লাশি, ব্যাগেজ পরীক্ষা বা কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতার অভিজ্ঞতার কথাও জানান। বিশেষ করে বিদেশফেরত যাত্রীদের সঙ্গে বহন করা পণ্য ও লাগেজের বিষয়ে নিয়মকানুন যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো–প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যাত্রীকে প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে বোঝানো হচ্ছে কি না। ট্রলি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে যাত্রীদের ভোগান্তির কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামার পর লাগেজ পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রলি না পাওয়া একজন যাত্রীর জন্য নিঃসন্দেহে অসুবিধাজনক ও হয়রানীও বটে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি-সংকট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ট্রলি সরবরাহের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। এ ধরনের সমস্যা হয়তো অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা, চাহিদা বা পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে হতে পারে। কিন্তু যাত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে কারণ যাই হোক, সেবাটি সময়মতো পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনেক সময় কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে হয়। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপের মধ্যেও তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই কোনো একটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো বিমানবন্দর বা সব কর্মীর সেবাকে মূল্যায়ন করা যুক্তিসংগত নয়। তবে কিছু যাত্রীর পক্ষ থেকে কর্মীদের আচরণ নিয়ে অসৌজন্য বা অপ্রত্যাশিত ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যায়। কোনো অভিযোগ সত্য হলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃঢ়তা এবং যাত্রীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ–দুটিই একই সঙ্গে বজায় রাখা সম্ভব। বিশেষ করে প্রথমবার বিমানযাত্রা করা কিংবা দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা শ্রমজীবী প্রবাসীদের অনেকেরই বিমানবন্দরের জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে সীমিত ধারণা থাকতে পারে। তাঁদের ক্ষেত্রে সহায়ক তথ্য ও দিকনির্দেশনা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
সেবার বিনিময়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থ বা বকশিশ চাওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। এবং এসব হয়রানী হচ্ছে কিনা তা গোপনীয়ভাবে মনিটরিং করা দরকার। কিন্তু অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ সরকারি বা বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কোনো সেবার ক্ষেত্রে যাত্রীকে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে হওয়া সেবাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিমানবন্দর এমন একটি জায়গা যেখানে নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা যায় না। সন্দেহজনক লাগেজ পরীক্ষা করতে হবে, পাসপোর্ট ও ভিসা যাচাই করতে হবে, কাস্টমস আইন প্রয়োগ করতে হবে। যাত্রীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে নিরাপত্তা প্রক্রিয়া বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নিরাপত্তা এবং যাত্রীসেবাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখারও কারণ নেই।
আধুনিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপত্তা বজায় রেখেই যাত্রীর সময় ও অভিজ্ঞতাকে উন্নত করা। একজন যাত্রীকে অতিরিক্ত পরীক্ষা করতে হলে তার কারণ ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে যতটা সম্ভব পরিষ্কার তথ্য দেওয়া যেতে পারে। কোথায় যেতে হবে, কী কাগজ লাগবে এবং কোনো সমস্যায় কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে–এসব তথ্য সহজে পাওয়ার সুযোগ থাকা দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন ব্যস্ত বিমানবন্দরে যাত্রীসেবাকে প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরেও বিশেষ সহায়তা, তথ্যসেবা, লাগেজ ট্রলি, ওয়াই-ফাইসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু যাত্রীকে আরাম দেওয়া নয়; বরং পুরো যাত্রাপথকে পূর্বানুমানযোগ্য ও সহজ করা। যাত্রী জানেন কোথায় যেতে হবে, কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে এবং কোন পর্যায়ে কী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
বাংলাদেশের বিমানবন্দরেও সব সুবিধা একইভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে–এমনটা ধরে নেয়ার কারণ নেই। প্রতিটি দেশের অবকাঠামো, যাত্রীর সংখ্যা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামো আলাদা। কিন্তু যাত্রীসেবার মূলনীতি–স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রাপ্তি, সময়ানুবর্তিতা, সহায়ক আচরণ ও জবাবদিহি–এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে? প্রথমত, বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য পরিষ্কার সময়সীমা ও সেবার মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোন প্রক্রিয়ায় সাধারণত কত সময় লাগবে, কোথায় বিলম্ব হলে অভিযোগ করা যাবে–এসব তথ্য দৃশ্যমান করা দরকার। দ্বিতীয়ত, কাস্টমস ও ব্যাগেজসংক্রান্ত নিয়ম আরও সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। কোন পণ্য ব্যক্তিগত ব্যবহারের, কোন পণ্যে শুল্ক প্রযোজ্য এবং কোন পণ্য বহনে বিধিনিষেধ রয়েছে–এসব বিষয়ে যাত্রীকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই তথ্য পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ট্রলি ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে সক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। যাত্রীসংখ্যা বাড়লে সেই অনুপাতে সেবা-সুবিধাও বাড়াতে হবে। চতুর্থত, অভিযোগ ও প্রতিকারব্যবস্থা আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর করা জরুরি। বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি, হটলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যম সহজে দৃশ্যমান থাকা উচিত। অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি তার নিষ্পত্তির অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পঞ্চমত, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নিরাপত্তা, আইন ও বিধি প্রয়োগের পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীকে সহায়তা এবং সংকট মোকাবিলার বিষয়গুলোও প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া উচিত। ষষ্ঠত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ই-গেট, স্বয়ংক্রিয় ইমিগ্রেশন, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা, অনলাইন তথ্যসেবা এবং ব্যাগেজ ট্র্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তি যেখানে বাস্তবসম্মত, সেখানে ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এর ফলে ব্যক্তিনির্ভরতা কমবে এবং প্রক্রিয়াগুলো আরও স্বচ্ছ হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি করার আগে আমাদের একটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা দরকার–তাঁরা যেন অন্য সব নাগরিকের মতোই যথাযথ, নিরাপদ ও সম্মানজনক সেবা পান। তাঁদের অবদান বিবেচনায় বিমানবন্দরে সহায়তার কিছু বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে পারে। বিশেষ করে বিদেশফেরত শ্রমিকদের জন্য তথ্য, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, পরিবহন ও জরুরি সহায়তা সহজলভ্য করা যেতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ককে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো, বিমানবন্দরে সেবা পেতে যেন কারও ব্যক্তিগত পরিচয়, প্রভাব বা অনুগ্রহের প্রয়োজন না হয়। নিয়ম সবার জন্য একই হবে এবং সেই নিয়ম প্রয়োগ হবে স্বচ্ছভাবে–এটাই হওয়া উচিত মূলনীতি। প্রবাসীদের অবদান নিয়ে আমরা গর্ব করি। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের প্রতি সম্মান শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা বিশেষ দিবসের আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
সম্মানের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ হতে পারে বিমানবন্দরের একটি সুশৃঙ্খল সারি, পর্যাপ্ত ট্রলি, দ্রুত ও স্বচ্ছ ইমিগ্রেশন, পরিষ্কার কাস্টমস প্রক্রিয়া, সহজে পাওয়া তথ্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর পেশাদার আচরণ। বাংলাদেশের বিমানবন্দরকে বিশ্বের অন্য বিমানবন্দরের হুবহু অনুকরণ করতে হবে না। আমাদের নিজস্ব বাস্তবতা ও সক্ষমতা বিবেচনায় একটি কার্যকর মডেল তৈরি করাই যথেষ্ট। তবে সেই মডেলের কেন্দ্রে থাকতে হবে যাত্রী, তাঁর নিরাপত্তা, সময় ও মর্যাদা। প্রবাসী দেশে ফিরবেন–এটি কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়। তিনি দেশেরই একজন নাগরিক। বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রথম যে আচরণটি দৃশ্যমান হয়, সেটিই অনেক সময় দেশের প্রতি তাঁর সামগ্রিক অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত অভিযোগের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং অভিযোগের কারণ কমিয়ে আনা। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেই দ্রুত, স্বচ্ছ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা। আমাদের প্রবাসীদের সম্মান জানাতে নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি বিমানবন্দর, যেখানে নিয়ম মেনে সেবা পাওয়াটাই হবে স্বাভাবিক এবং হয়রানি বা অনিয়ম হবে ব্যতিক্রম, কোনোভাবেই ব্যবস্থার অংশ নয়।
আরও পড়ুন:







