অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে বেশ কয়েকটি নৃশংস ঘটনা জাতিকে স্তব্ধ করে দিল। এমনকি অপরাধির বাড়িঘরে হামলা-অগ্নিসংযোগের মতো ‘গণমব’-এর ভয়াবহতাও দেখতে হলো। সংবাদমাধ্যম এসব ঘটনায় উত্তেজনাকর, ভয়জাগানো ভিডিওচিত্র ও কাঁচাতথ্য পরিবেশন করেই যাচ্ছে শুধু। মতামত পাতায় অপরাধের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও হাজির করছেন অনেকে।
গেল এক সপ্তাহের মেইন মিডিয়ার কয়েকডজন খবর আর মতামত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রথম আলো ছাড়া সামাজিক অপরাধ অনুসন্ধানের চেষ্টা তেমন নেই-ই। আর সেই অনুসন্ধানেও গভীর সামাজিক ক্ষতটার সামগ্রিক চিত্র গড়হাজির। গভীর সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক কারণও অনুপস্থিত। সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে মিডিয়ার অসহায়ত্ব মূলত এখানেই।
কারণ, প্রচলিত সাংবাদিকতা মূলত দৃশ্যমান ঘটনার তথ্য -উপাত্ত ধরেই এগোয়। কে অপরাধ করল, কী ঘটল, কোথায় ঘটল, রাষ্ট্র কী করল-এভাবে। এসবই তথ্যনির্ভরতা। অথচ, সামাজিক অপরাধের দৃশ্যমান ঘটনার গভীরে কাজ করে অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া। যেখানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সমাজিক পরিবারিক বঞ্চনা, মর্যাদাহীনতা, পরিচয়-সংকট, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, দলভুক্তি আর সহিংসতার বৈধতা।
মিডিয়ার একাডেমিক সিলেবাসের বাইরে সংবাদকর্মীদের ভাবনা সত্যিই মহান। “সমস্যা যেখানে সংবাদমাধ্যম সেখানে, সমস্যার গভীরতা যতটা, তার চেয়েও গভীরে হবে অনুসন্ধান”-এভাবেই কাজ করে তাদের ভাবনা। অথচ, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক বিশেষত সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণযোগ্য করার মতো কোনো পথরেখা দিতে পারে না সেই মহান ভাবনা।
গত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতামুখী রাজনীতির সঙ্গে মিডিয়ার যে আন্তঃসম্পর্ক গভীরতা পেয়েছে তাতে রাষ্ট্রযন্ত্র আর সরকারব্যবস্থার নিচে চাপা পড়েছে সমাজ। মতামত কলামে কিছুটা দায়সারা হলেও ক্ষমতার সংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদার বিকৃতি, আপেক্ষিক বঞ্চনা, গোষ্ঠীসংস্কৃতি ও অপরাধের মধ্যে অন্তঃসম্পর্ক অনুসন্ধানে মনোযোগ হারিয়েছেন মিডিয়ার নীতিনির্ধারকরা।
এক্ষেত্রে তারুণ্যে ভরপুর নতুন প্রজন্মের যেসব সম্পাদক বা নিউজম্যান মিডিয়াকে লক্ষ্যমুখী বা সমাজমুখী করতে উৎসাহী তাদের নতুন এক ভাবনায় আসতে হবে। ‘সমাজের হার্ড নিউজ’ ধারণা সামাজিক অপরাধের পেছনে থাকা সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক, মূল্যবোধ, মনস্তত্ত্ব ও আচরণের পরিবর্তন অনুসন্ধান করবে।
যেখানে কে বা কারা হত্যা করল, কীভাবে করল-এসব সরল-গতানুগতিক প্রশ্নের আড়ালে থাকা আরও কারণ অনুসন্ধান করবে। কোন সমাজ একজন কিশোর-তরুণকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে যেখানে সহিংসতা তার কাছে ক্ষমতা-মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠছে?এসব গভীর প্রশ্নই তথ্য-উপাত্তের রিপোর্টিং থেকে সামাজিক পরিবর্তন অনুসন্ধানে নিয়ে যেতে পারে।
অপরাধী বা অপরাধের শিকার ব্যক্তিই শুধু নয়, অপরাধ উৎপাদনকারী সামাজিক পরিবেশকে অনুসন্ধানের লক্ষ্য বানাতে পারে নিউজরুমের ‘সোসাইটি ডেস্ক’। যেখানে অপরাধকে সামাজিক উৎপাদন হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। তাতে যে সামাজিক কাঠামো অপরাধের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে তা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। উন্মুক্ত হবে ‘ক্ষমতার সেই সংস্কৃতি’ যা অপরাধকে সামাজিক বৈধ্যতা বা মর্যাদা দিতে সহায়তা করছে। নিয়ন মতিয়ুল, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ
আরও পড়ুন:







