শুক্রবার

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০ আশ্বিন, ১৪৩৩

মানুষ আদম সন্তান, সৃষ্টি একজনেরই, কেন এক ঐন্দ্রজালিক গোঁলক ধাঁধায় মানুষের জীবন ঘুরপাক খায়?

জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লব,ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:২৭

শেয়ার

মানুষ আদম সন্তান, সৃষ্টি একজনেরই, কেন এক ঐন্দ্রজালিক গোঁলক ধাঁধায় মানুষের জীবন ঘুরপাক খায়?
ছবি: সংগৃহীত

মানুষে মানুষে পার্থক্য বা ভিন্নতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের ক্ষেত্রে অন্তত বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের আপ্রাণ চেষ্টা করে দ্বিধাহীনভাবে। এই মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা এসব মৌলিক চাহিদাগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে যে মূল চালিকাশক্তি তা হলো অর্থ। সব মানুষের অর্থ উপার্জন আবার একই ধারার নয়। এখানেও রয়েছে বৈষম্য-বৈপরীত্য। তাছাড়া অর্থ উপার্জনের পথগুলোর মধ্যে রয়েছে মানুষের পদাধিকারের বৈষম্য বা পদমর্যাদার বৈষম্য, শ্রেণিবৈষম্য তো রয়েছেই। মানুষের জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদাগুলো এবং জীবন মানের ন্যূণতম সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্হাগুলো বিধানের ক্ষেত্রে যখন কোন সমাজে, জাতিতে, দেশে ভিন্নতা প্রকট হয়ে দেখা দেয় তখন তাকে বলা যায় মানবতার সংকট। প্রাকৃতিকভাবে সমান অধিকার নিয়ে জন্মে সামাজিক বৈষম্যের শিকার কত মানুষ!

জীবিকার তাগিদে যারা প্রতিদিন কঠোর সংগ্রামে লিপ্ত থাকে, দুঃখ-দীনতাই যাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মাথা গোঁজার ছাদ থাকে না, পরনের বস্ত্র থাকে না, দু'বেলা অন্ন জোটে তো বিদ্যার্জনের সামর্থ্য থাকে না। অবহেলিত এই মানুষগুলোর কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, নেই তাদের ঘরে জন্ম নেয়া শিশু-কিশোরদের কোনো ভবিষ্যত। তাদের পথশিশুরা সমাজের একশ্রেণীর মানুষের কাছে মায়ামমতাহীন নির্দয় আচরণের শিকার। এরা সমাজে সবসময় অবহেলিত। নিজেদের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে দু'মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে চায়, এজন্য যেকোনো ধরনের কাজে তাদের দ্বিধা নেই। বাধ্য হয়ে কলকারখানায়, ইটভাটায় কিংবা কোনো দোকানে অথবা বাস আর রেল স্টেশনে শ্রম বেঁচে তারা। বেঁচে থাকে নামমাত্র, যেমনটা বেঁচে থাকে শুকিয়ে যাওয়া নদী, পাতা-ঝরা গাছ একবুক হতাশা আর লাঞ্ছনা বয়ে রুক্ষ ইতিহাস রূপে।

আবার কেউ কেউ আছে যারা জন্মলগ্ন থেকেই অপরের উপর নির্ভরশীল, অপরের দান-দক্ষিণায় জীবিকা নির্বাহ করে। ভিক্ষের ঝুলি পেতে রাস্তায় বসে ভিক্ষে করে, পেটের ক্ষুধা নিবৃত্তি করে। আত্মরক্ষা করে শহরের অলি গলিতে কিংবা রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে, ফুটপাতই তাদের স্বপ্ন, ফুটপাতেই তাদের বেঁচে থাকার আশ্রয়স্থল, ফুটপাতেই তাদের থাকা খাওয়া। বংশানুক্রমেই তারা যাযাবর শ্রেণীর, ভিটেমাটি কোনকালেই ছিল না ৷ আবার কারো কারো সেটুকুও জোটে না আমরা যাদের ছিন্নমূল বলি, যাদের পরনে বস্তাপচা ছেঁড়া-ফাটা-ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত জামা কাপড়। কাকের বাসার মতো রুক্ষ শুষ্ক এলোমেলো চুল কাঙ্গালের মতো কঙ্কালসার চেহারা, যারা ঠিকানা হীন, আশ্রয়হীন, স্বজনহীন, সম্বলহীন, যারা নালা-নর্দমার সংলগ্ন অশুচি নোংরা ঘৃণ্য জগতের বাসিন্দা।

যারা আজও আমাদের সভ্য সমাজে অতি নগণ্য, নিম্ন স্তরের মানুষ। যাদের স্পর্শ করতে আমরা ঘৃণা করি, অবজ্ঞা করি, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি যাদের সংস্পর্শ থেকে আমরা সর্বদা দূরে সরে থাকি, উপেক্ষা করে চলি। তুলনামূলক ভাবে এদের সংখ্যা আমাদের বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। অথচ একই ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেও দেশের নাগরিক হিসেবে এরা কখনো বিবেচিত হয় না। রিলিফের চাল, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতায় তারা তালিকাভুক্ত হয় না কোন জনমেই।

আমরা একবারও ভেবে দেখি না যে, একমাত্র আর্থিক অভাবেই এরা মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত, অবহেলিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত এবং নিগৃহীত। নেই সামাজিক বৈষম্যের শেকলটা ভাঙ্গার মত অদম্য শক্তি, সাহস। যার ফলে এরা ভাষা জানে না, ব্যবহার জানে না, সভ্য মানুষের মতো শান্তি ও সুশৃঙ্খলভাবে জীবন যাপন করতে জানে না। নিজের প্রাপ্য অধিকারটুকুও দাবি করতে জানে না। সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা-আদর-স্নেহ-মায়া-মমতা ও ভালোবাসার মূল্যবোধের অভাবে নিজের অস্তিত্বই এরা জাহির করতে পারে না। নামাজ রোজা কি তারা বোঝে না এমনকি তাদের মধ্যে ধর্মীয় কোন কর্মকাণ্ডে নেই কোন বুদ্ধি-জ্ঞান ৷ ক্রমান্বয়ে দুঃখের দহনে জীবনের মূল্যবোধ, মানবিক চেতনা, মনুষ্যত্ববোধ, মান-অভিমানবোধ বলতে এদের কিছুই নেই। এদের শরীর আছে, আবেগ-অনুভূতি নেই, প্রাণ আছে, হৃদয় নেই। কৃতদাসের মতো ধিক্কার, তিরস্কার, লাঞ্ছনা আর বঞ্চনাই যাদের প্রতিদিন'কার খোরাক। শুধু সন্দেহবশত অপরাধ না করেও যে কেউই বেধম পিটিয়ে যায় নিরুপায়, নিরুত্তর ফেল ফেল তাকিয়ে থাকে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে বহু আগেই। তাতেও বোধহয় হায়েনারা তৃপ্ত হয় না, তাই এরা অবলীলায় নিজের প্রাণটাই দিয়ে দেয় বিসর্জন ওভার ব্রিজের নিচে, রাস্তারধারে, ট্রেনলাইনের পাশে, বাসস্টেশনে কিংবা বস্তির কোনো ঘুপচি ঘরে। যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েও আমরা অপারগ, উপেক্ষা করে চলি। বরং এটাই নিয়তি, এখন হামেশাই এরকম ঘটছে, ঘটবে! মানবতা, স্নেহ-মায়া-মমতা বিলীন হতে চলেছে ডিজিটাল রঙ্গে ভরা বঙ্গ দেশে।