মঙ্গলবার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩

'জিন্নাহকে ঘিরে রাজনীতি: মুসলিম জাতীয়তাবাদ বনাম ইসলামী জাতীয়তাবাদ'

শিব্বির আহমেদ রানা (লেখক ও কলামিস্ট)

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:২৬

শেয়ার

'জিন্নাহকে ঘিরে রাজনীতি: মুসলিম জাতীয়তাবাদ বনাম ইসলামী জাতীয়তাবাদ'
ছবি: শিব্বির আহমেদ রানা

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঘিরে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্ক আসলে শুধু একজন ঐতিহাসিক নেতাকে নিয়ে বিতর্ক নয়; এর গভীরে রয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য বোঝার প্রশ্ন। মুসলিম জাতীয়তাবাদ বলতে এমন একটি রাজনৈতিক ধারণাকে বোঝায়, যেখানে কোনো ভূখণ্ডের মুসলমানদের অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, সামাজিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক অধিকারকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাতিসত্তা বা জাতীয় স্বার্থের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ এর মূল প্রশ্ন–মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের পরিচয় ও স্বার্থ কীভাবে নির্ধারণ করবে।

এটি ব্যক্তির ধর্মাচরণের মাত্রার সমার্থক নয় এবং ইসলামী রাষ্ট্রতত্ত্বেরও সরাসরি সমার্থক নয়। অন্যদিকে ইসলামী রাজনৈতিক মতাদর্শের কেন্দ্রে থাকে ইসলামকে রাষ্ট্র, সমাজ, আইন, অর্থনীতি ও নৈতিকতার একটি আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। এই পার্থক্যটি উপমহাদেশের ইতিহাস বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিন্নাহ ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক নেতাদের একজন। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের রাজনীতি ভারতীয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়, প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকে পৃথক রাষ্ট্রের আন্দোলনে রূপ নেয়। কিন্তু তাঁকে মওলানা আবুল আ'লা মওদুদীর ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। মওদুদীর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন; জিন্নাহর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাতিসত্তা ও সমষ্টিগত স্বার্থ। তাই একজন ব্যক্তি ধর্মীয়ভাবে খুব অনুশীলনকারী না হয়েও মুসলিম জাতীয়তাবাদী হতে পারেন; আবার অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান হয়েও ইসলামী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী নাও হতে পারেন। এই জায়গাটিই জিন্নাহকে বোঝার মূল চাবিকাঠি।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম পরিচয় ও মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নটি শুধু মুসলিম লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবদুল হামিদ খান ভাসানী থেকে শুরু করে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়েও মুসলিম সমাজের পরিচয় ও স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়–এটি ছিল রাজনৈতিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের মুসলিম পরিচয় বিলীন হয়ে যায়নি। পাকিস্তান আমলের নির্বাচনী রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রচারণাতেও মুসলিম পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি ও ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতীকের ব্যবহার ছিল; ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ‘আল্লাহু আকবর’ কিংবা ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান ব্যবহারের নজিরও রাজনৈতিক ইতিহাসে রয়েছে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের বাস্তবতা বদলে যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ হয় এবং আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নতুন আদর্শিক কাঠামো গ্রহণ করে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল কোনো ধারণা থেকে সরে এলেই সমাজ থেকে সেই ধারণা মুছে যায় না। এই জায়গাতেই জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির তাৎপর্য রয়েছে।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একই জাতীয়তাবাদী কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা ছিল। বিএনপির ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা’ এবং বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম–এ ধরনের বক্তব্য সেই রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ, পিডিপি, ন্যাপ, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির বহু নেতা-কর্মীর এই দলে যোগদানও দেখায় যে দলটি শুধু একটি ব্যক্তির রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল না; বরং তখনকার সমাজে বিদ্যমান নানা জাতীয়তাবাদী ও মুসলিম পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রবাহকে একটি নতুন প্ল্যাটফর্মে একত্র করার সক্ষমতা তার ছিল। এই অর্থে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মুসলিম জাতীয়তাবাদের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে; তবে সেটিকে জামায়াতে ইসলামীর ইসলামী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে এক করে দেখা সমীচীন নয়।

এখন জিন্নাহকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের জায়গাটি আরও পরিষ্কার হয়। জামায়াতে ইসলামী বা তাদের রাজনৈতিক পরিসরের কেউ যদি জিন্নাহ, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী কিংবা ভাসানীর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করে, তার পেছনে আদর্শিক ও নির্বাচনী–দুই ধরনের বাস্তবতা থাকতে পারে। একটি আদর্শিক ইসলামী দল যখন বৃহত্তর নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয়, তখন তাকে শুধু নিজস্ব মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না; বৃহত্তর সামাজিক পরিচয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হয়।

মুসলিম পরিচয় সেই বিস্তৃত রাজনৈতিক পরিসরের একটি সম্ভাব্য ভিত্তি। ফলে একসময় যে জিন্নাহকে জামায়াতের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বাইরে রাখা হতো, তাঁকে এখন নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রবণতা দেখা গেলে সেটিকে কেবল ইতিহাসচর্চা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর মধ্যে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে। কিন্তু এখানেই বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। জামায়াত জিন্নাহকে স্মরণ করছে বলেই বিএনপিকে জিন্নাহবিরোধী হতে হবে–এমন কোনো ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক যুক্তি নেই। জিন্নাহকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে স্বীকার করা মানেই পাকিস্তানের পরবর্তী সব রাষ্ট্রনীতি সমর্থন করা নয়; আবার তাঁকে ঐতিহাসিকভাবে মূল্যায়ন করা মানেই জামায়াতের রাজনীতি সমর্থন করাও নয়। একইভাবে জিন্নাহকে সমালোচনা করা মানেই মুসলিম জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করা নয়। বরং সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সমকালীন দলীয় বিরোধের কারণে ইতিহাসের চরিত্রকে ‘আমাদের’ বা ‘ওদের’ সম্পত্তি বানানো হয়। ভারতের রাজনীতিতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ঘিরে যে ধরনের রাজনৈতিক মালিকানার প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তার সঙ্গেও এর কিছুটা তুলনা করা যায়। প্যাটেল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ছিলেন; পরবর্তী সময়ে বিজেপি তাঁকে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। কিন্তু প্যাটেলকে বিজেপির আদর্শের একমাত্র প্রতীক বানানো যেমন ইতিহাসের সরলীকরণ, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে কংগ্রেসের অস্বস্তিও ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করে। জিন্নাহর ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। তিনি জামায়াতের ছিলেন না, বিএনপিরও ছিলেন না; তিনি তাঁর সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে প্রয়োজন পরিচয়ের রাজনীতিকে স্লোগানের বাইরে গিয়ে বোঝা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, মুসলিম পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামী মূল্যবোধ–এসবকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে দাঁড় করালে বাংলাদেশের বাস্তব সমাজকে বোঝা কঠিন হবে। একজন মানুষ একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মুসলমান, জাতীয়তাবাদী এবং গণতন্ত্রের সমর্থক হতে পারেন। তাই মুসলিম জাতীয়তাবাদকে সরাসরি ‘ইসলামী রাজনীতি’ কিংবা ‘ডানপন্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ভুল, তেমনি এটিকে নিছক ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি বলাও অসম্পূর্ণ। এটি মূলত মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে পরিচয়, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও সমষ্টিগত রাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি করার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ধারণা। জিন্নাহ এই ধারার সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক রূপকারদের একজন হলেও তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাঁর সময়, বক্তব্য, রাজনৈতিক কৌশল এবং ১৯৪৭-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেয়া জরুরি। একইভাবে মওদুদীর ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনকে জিন্নাহর মুসলিম জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়।

রাজনীতির স্বার্থে ইতিহাসকে খণ্ডিত করা সহজ; কিন্তু একটি জাতির পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় হলো–সে নিজের পছন্দের ইতিহাস যেমন জানে, তেমনি অস্বস্তিকর ইতিহাসও স্বীকার করতে পারে। জিন্নাহকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করার প্রয়োজন নেই, তাঁকে অন্ধভাবে খারিজ করারও প্রয়োজন নেই। তাঁকে ইতিহাসের আলোতেই বিচার করতে হবে। কারণ কোনো দল কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে গ্রহণ করলেই তিনি সেই দলের একার সম্পত্তি হয়ে যান না। ইতিহাসকে দলীয় মালিকানা থেকে মুক্ত রাখা এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদকে ইসলামী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা–বাংলাদেশের বর্তমান পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি বোঝার জন্য এই দুটিই সবচেয়ে জরুরি।

শিব্বির আহমেদ রানা (লেখক ও কলামিস্ট)

বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।

ই-মেইল: [email protected]