মঙ্গলবার

২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও সিন্ডিকেটের শঙ্কা

মোঃ রেজাউল করিম

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫৯

শেয়ার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও সিন্ডিকেটের শঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। কিন্তু এই বাজারকে ঘিরে নিয়োগপ্রক্রিয়া, এজেন্সি নির্বাচন ও অভিবাসন ব্যয় নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। এবার মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্তের খবর নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বাংলাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৪৮৬। সেখানে বিপুলসংখ্যক বৈধ ও যোগ্য এজেন্সি থাকার পরও কেন মালয়েশিয়ার মতো বড় একটি শ্রমবাজারকে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এখানে বিষয়টি শুধু ২৫টি এজেন্সির সংখ্যা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, কোন মানদণ্ডে এসব এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছে, কারা তালিকা তৈরি করেছে, কী প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এই সীমিত প্রবেশাধিকারের ফলে কারা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর না পাওয়া গেলে নতুন সিদ্ধান্তটি স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরি করবে।

পুরোনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি কেন

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ২০১৬ সাল থেকেই সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবস্থা দেখা গেছে। কখনো ১০টি, কখনো ২৫টি, আবার পরে ১০০টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই এজেন্সির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।

কিন্তু মূল সমস্যাটি সংখ্যার চেয়ে বড়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকার পরও কেন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য বড় একটি শ্রমবাজারে বিশেষ প্রবেশাধিকার তৈরি হবে, সেই প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

একটি প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে যোগ্য সব এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত। নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাজার সীমাবদ্ধ হয়ে গেলে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী, অতিরিক্ত কমিশন, কৃত্রিমভাবে অভিবাসন ব্যয় বাড়ানো এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা গিয়ে পড়ে বিদেশগামী শ্রমিকের ওপর।

সবচেয়ে বড় চাপ শ্রমিকের ঘাড়ে

একজন বাংলাদেশি কর্মীর বিদেশযাত্রা অনেক সময় শুরু হয় ঋণ দিয়ে। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ গবাদিপশু বিক্রি করেন, কেউ স্ত্রীর গয়না বন্ধক রাখেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ যাওয়ার আগেই তিনি বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা কাঁধে নেন।

এরপর প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া, কম বেতন, নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা কিংবা অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক বছর বিদেশে কাজ করেও অনেক শ্রমিককে শুধু ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

তাই মালয়েশিয়ায় একজন বাংলাদেশি কর্মীর অভিবাসন ব্যয় কেন অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় বেশি হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা এর সুবিধা পাচ্ছে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার কোন স্তরে ব্যয় বাড়ছে, তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা জরুরি।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ তদন্তের দাবি রাখে

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। তবে অভিযোগ বারবার উঠলে তা উপেক্ষা না করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করা প্রয়োজন।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রমাণ ছাড়া দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বারবার ওঠা অভিযোগের তদন্ত না করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের পরও যদি একই ধরনের কাঠামো বা সুবিধা অব্যাহত থাকে, তাহলে এর পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বর্তমান সরকারের দায় বেশি

পুরোনো সরকারের সিদ্ধান্ত বা অতীতের ভুল দেখিয়ে বর্তমান সরকার নিজের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। একটি নতুন সরকার যখন পূর্ববর্তী ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, তখন সেটি আর কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা থাকে না; সেটি বর্তমান সরকারের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে কোনো অনৈতিক লেনদেনে জড়িত—এমন দাবি প্রমাণ ছাড়া করা উচিত নয়। তবে সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর সরকারের নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় অবশ্যই সরকারের ওপর বর্তায়।

সরকার যদি মনে করে সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোতেই স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও শ্রমিকের স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে নিশ্চিত হবে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

আর যদি এই ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা কমে, অভিবাসন ব্যয় বাড়ে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা তৈরির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সরকার কেন সেটি বহাল রাখছে, সেই প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে।

সরকারের করণীয় কী

প্রথমত, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নির্দিষ্টসংখ্যক নির্বাচিত এজেন্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ২০১৬ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত এজেন্সিগুলোর আর্থিক লেনদেন, কমিশন কাঠামো, বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, একজন কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে, তার বাস্তবসম্মত ও বাধ্যতামূলক সীমা নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিটি আর্থিক লেনদেন ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা উচিত।

চতুর্থত, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সরকার-টু-সরকার আলোচনার মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ করতে হবে। নিয়োগকর্তা, এজেন্সি ও কর্মীর আর্থিক দায়দায়িত্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা দরকার।

পঞ্চমত, সিন্ডিকেট বা স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বারবার উঠেছে, তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীতিনির্ধারণে বিশেষ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সীমিত করা উচিত।

পরিবর্তনের আসল পরীক্ষা এখানেই

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনো ব্যক্তি, ব্যবসায়ী বা সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি লাখো শ্রমিকের জীবন, জীবিকা এবং অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

সরকার পরিবর্তনের অর্থ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। এর অর্থ নীতি, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনা। নতুন সরকার যদি পুরোনো বিতর্কিত কাঠামোকেই নতুন অনুমোদনে চালু রাখে, তাহলে মানুষের কাছে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

তাই সরকারের সামনে এখন পরিষ্কার দুটি পথ। একটি হলো সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রমবাজার পরিচালনা করা, অন্যটি হলো যোগ্য সব এজেন্সির জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও শ্রমিকবান্ধব করা এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা।

প্রবাসী শ্রমিকের ঘাম, শ্রম ও ঋণের টাকা যেন কোনো সীমিত স্বার্থগোষ্ঠীর অতিরিক্ত মুনাফার উৎস না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বর্তমান সরকার সেই দায়িত্ব কতটা পালন করতে পারে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিদ্ধান্তই তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মোঃ রেজাউল করিম

গবেষক- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ