মঙ্গলবার

১১ আগস্ট, ২০২৬ ২৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের কোলে তসলিমা: হিপোক্রেসির সাতকাহন ও হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের শঙ্কা

মাহতাব মুহাম্মদ, কলামিস্ট ও গবেষক

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:১৬

আপডেট: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:১৯

শেয়ার

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের কোলে তসলিমা: হিপোক্রেসির সাতকাহন ও হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের শঙ্কা
ছবি মাহতাব মুহাম্মদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশ যখন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ, ফ্যাসিস্ট হাসিনার ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরত আসার ঘোষণা ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা সত্ত্বেও হাসিনাকে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়া এবং কলকাতায় হঠাৎ চরম সাম্প্রদায়িক, বাংলাদেশবিরোধী ও ইসলামবিদ্বেষী তথাকথিত এক লেখিকার উপস্থিতি বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক আলাপে অনেক যদি কিন্তু যুক্ত করেছে। পশ্চিমবঙ্গে তসলিমা নাসরিনের আগমনকে খালি চোখে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মনে হলেও আদতে বিষয়টি মোটেই স্বাভাবিক নয়। যখন বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে, বাংলাদেশে রামমন্দির নির্মাণের এক ঘটনা নিয়ে মতবিরোধ চলছে, বাংলাদেশে ভারতের জোরপূর্বক পুশব্যাকের ঘটনা ঘটছে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক স্পেস বের করার চেষ্টা তদবির করছে; সেই মুহূর্তে কেন বিজেপির মতো চরম মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক ও উগ্র হিন্দত্ববাদী দল তসলিমা নাসরিনের মতো বিতর্কিত লেখিকাকে আমন্ত্রণ জানালো, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তসলিমা নাসরিন ভারতে আসার পর শুভেন্দু অধিকারীর মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও বাংলাদেশবিরোধী নেতা ঘোষণা দিলো যে, তসলিমাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তসলিমা নাসরিন ভারতে এসে বেশ কিছু কথা বলেছে। এক সাংবাদিক তাকে ভারতের হিন্দু উগ্রবাদী ও হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তসলিমা নাসরিন জবাবে বলে, "...হিন্দু উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে যদি প্রতিবাদ করতে হয় সেটা তো এখানে জনগণ যথেষ্ট আছেন, করবেন...আমার দায়িত্ব পড়েনি যে সমস্ত মৌলবাদ নিয়ে আমি সমানভাবে প্রতিবাদ করবো।" তার মানে, সে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। তথাকথিত 'মুক্তমনা ও মানবতাবাদী' দাবিদারদের অবস্থা হলো এই! তাদের মুক্তমতের চর্চা, মানবতার চর্চা, বাকস্বাধীনতার চর্চা সিলেক্টিভ, যা কেবল ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে। অন্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের উগ্রতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই নীরব। এ ধরনের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ও হিপোক্রেসি করেও তারা নিজেদের বিশ্বের মহান 'প্রগতিশীল' বলে দাবি করে থাকেন, যেন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ও হিপোক্রসিই তথাকথিত প্রগতিশীল হবার প্রাথমিক শর্ত।

এদিকে, তসলিমা নাসরিন প্রত্যাশা করেছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশে ফেরে। তার মতে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নাকি উচিৎ হয়নি (যদিও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি; কেবল দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে 'রাজাকারদের উত্থান' বলে কটাক্ষ করেছে। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনুসকে

'বিবেকবর্জিত, প্রতিহিংসাপরায়ণ, হিস্র ও মৌলবাদীদের গুরু' বলে গালাগালি করে ইউনুস সরকারকে উৎখাতের আহ্বান করেছিলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে 'সভ্যতাবিরোধী' আখ্যা দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে সে বলেছে, তারেক রহমানের কপালে সিজদার চিহ্ন আছে। তারেক রহমান নামাজ পড়েন। একজন ব্যক্তি নামাজ পড়লে তসলিমা নাসরিনের কাছে সভ্যতাবিরোধী বলে মনে হয়। এর চেয়ে সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী আচরণ আর কী হতে পারে! এই চরম বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী নাস্তিক লেখিকা দাবি করেছে, “আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনাকে যে ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, তা ভুল ছিল। এটি ছিল অগণতান্ত্রিক। দলটিকে নিষিদ্ধ করা ছিল পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। আমি চাই হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসুন।” অর্থাৎ, তসলিমা নাসরিনের মতে, মাত্র এক মাসে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা এবং ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে আয়নাঘর বানিয়ে অসংখ্য মানুষকে গুম, খুন ও নির্যাতন করার পরও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা নাকি ভুল ছিল! সে চায় হাসিনার বিচার না হোক, মৃত্যুদণ্ড না হোক। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হোক, দলটি নির্বাচন করুক। হাসিনা নেতৃত্ব দিক, আবারও ক্ষমতায় আসুক। তসলিমা নাসরিনের এই বক্তব্য-বিবৃতি থেকে বোঝার বাকি থাকে না যে, তসলিমা নাসরিন আওয়ামী লীগ ও বিজেপির ফুট সোলজার হয়ে কলকাতায় এসেছে। তারই ধারাবাহিকতায়, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বৈরাচারী শাসনের পতন যখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত, তখন তসলিমা নাসরিন এই অভ্যুত্থানকে 'মৌলবাদী উত্থান' বা 'ইসলামী বিপ্লব' বলে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী যখন তসলিমা নাসরিনকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে, তখন বিষয়টি আর কেবল একজন লেখিকার সুরক্ষার বিষয় থাকে না। এটি স্পষ্ট করে যে, ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে তসলিমার বয়ানের একটি আদর্শগত মেলবন্ধন ঘটেছে এবং গোপন সমঝোতা হয়েছে। তা না হলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী একটা দল কী করে একটা ধর্মবিদ্বেষী নাস্তিককে ধুমধাম করে ফিরিয়ে আনে যাকে ভারত সরকার ধর্মবিদ্বেষ ছড়িয়ে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে বিতাড়িত করেছিল?

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ এবং ‘বাংলাদেশ থেকে হিন্দু নিগ্রহের’ বয়ানকে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণে ব্যবহার করে আসছে।

তসলিমা নাসরিনের বিতর্কিত বক্তব্য এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একপেশে সংবাদ পরিবেশন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষকে নতুন করে উত্তেজিত করে তুলতে পারে। আর সেই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটানো গেলে তা দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হবে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। তসলিমা নাসরিনের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও তাকে দিয়ে আরো বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশে এভাবে একটি অস্থিরতার চিত্র তৈরি করে ভারত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়ার প্রচেষ্টা চালাবে। তাছাড়া জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত নির্বাচিত সরকার যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনিক সংস্কারে ব্যস্ত, তখন ক্রমাগত বাইরে থেকে অস্থিরতার আবহ তৈরি করা হলে সরকারের মনোযোগ বিঘ্নিত হবে ও সংস্কার এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। অপরদিকে, শেখ হাসিনার ভারতে বসে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করা ও ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণার উদ্দেশ্য হতে পারে নেতা-কর্মীদের চাঙা করার চেষ্টা এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা, যাতে দেশে প্রশাসনিক কোনো দুর্বলতা দেখা দিলেই বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা যায়। এভাবে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে দেশে এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম হবে। ভারত এখনো মনে-প্রাণে চায় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ফিরুক। কারণ ভারত এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে সম্পূর্ণ মানিয়ে নিতে পারেনি। শেখ হাসিনাকে কার্ড হিসেবে হাতে রাখা এবং তসলিমা নাসরিনের মতো চরিত্রগুলোকে স্পেস দেওয়া ভারতের চাপ সৃষ্টি করে প্রভাব বজায় রাখার কূটনীতিরই অংশ।

লেখক: কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইমেইল: [email protected]



banner close
banner close