৫ই আগস্ট, ২০২৪ খ্রি.। দীর্ঘ ১৫ বছরের গুম, খুন, লুটপাট এবং আয়নাঘর বানিয়ে নির্যাতনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ ধ্বংস করার পর এক শক্তিশালী গণঅভ্যুত্থানে মাফিয়া হাসিনা ভারতে পলায়ন করে। এই দিনে লাখো মানুষের জনস্রোতে ভেসে গিয়েছিল আওয়ামী দুঃশাসনের অভিযাত্রা। মাত্র এক মাসে প্রায় ১৪০০ মানুষকে হত্যা করে হাসিনা পরিণত হয়েছিল ড্রাকুলা রাণীতে। এরপর দেখতে দেখতে দুটি বছর পার হয়ে গেল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ চালাল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসলো বিএনপি। কিন্তু এই দুই বছরে জুলাইয়ের ফসল আমরা কতখানি ঘরে তুলতে পেরেছি? ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচার কি শেষ করতে পেরেছি? হাসিনার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সঙ্গী-সাথীদের কি বিচার করতে পেরেছি? জুলাই-যোদ্ধাদের প্রাপ্য অধিকার কি দিতে পেরেছি? শহীদ পরিবারগুলোকে কি তাদের উপযুক্ত সম্মান ও প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে পেরেছি? আওয়ামী লীগের বিচার কি নিশ্চিত করা গেছে? যেসব সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টরা 'ওগো মা' বলে হাসিনার পায়ে লুটিয়ে পড়ত, তাদের কি জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল, তাদের বিচার কি হয়েছে? প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী দালালদের কি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গেছে? হাসিনার গৃহপালিত সাংবাদিকদের কি আইনের মুখোমুখি আনা গেছে? আদতে আমরা কিছুই করতে পারিনি। গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও আমাদের প্রাপ্তির খাতায় উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই। একটি 'জুলাই জাদুঘর' নির্মাণ ও উন্মোচন করতেই দুই বছর লাগল। আফসোস!
আমরা জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে না পারলেও যার যার মতো নিজেদের আখের গুছাতে ভুল করিনি। জুলাইয়ে রক্ত দিয়েছে সাধারণ ছাত্র, যুব ও শ্রমজীবী মানুষ। অথচ মেস ছেড়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে উঠেছে কিছু লোক; অটোরিকশা ছেড়ে দামি গাড়িতে চড়েছে কিছু লোক। মেম্বার হওয়ার যোগ্যতা যাদের ছিল না, তাদের কেউ কেউ আজ এমপি, মন্ত্রীও বনে গেছে। কিছু মানুষ রাতারাতি বনেদি জীবনের মালিক হয়ে গেছে। নিত্যনতুন জামাকাপড় আর টকশোতে কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে তারা একেকজন স্বঘোষিত 'জুলাই ঘোষক'। কেউ 'এক দফার ঘোষক', কেউ পুরো আন্দোলনের 'মাস্টারমাইন্ড', আবার কেউ বা জুলাই আন্দোলনের জন্মদাতার আসন নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। অথচ সাধারণ জুলাই-যোদ্ধাদের একটি বড় অংশ আজও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন; নানা জায়গায় মারধরের শিকার হচ্ছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন। আমাদের আজ এমন দৃশ্যও দেখতে হচ্ছে! সবাই যেন জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য মল্লযুদ্ধে নেমেছে, কিন্তু জুলাইয়ের মূল ফসল ঘরে তোলার দিকে কারও তেমন মনোযোগ নেই। আজও শুনতে হয়, দেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য টেলিগ্রামে গোপন গ্রুপ খুলে ষড়যন্ত্র করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এম অহিদুজ্জামান ঘোষণা দেয় যে, তারা প্রয়োজনে আন্দোলনে নামবে, জীবন দেবে। মেহের আফরোজ শাওনের মতো স্বঘোষিত জুলাইবিরোধী আওয়ামী দালালরা জুলাই আন্দোলনকে কটাক্ষ করেও দিব্যি মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকার তাহলে কী করছে? কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে? মাফিয়া হাসিনা কীভাবে আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দেয়ার সাহস পায়? রক্তাক্ত জুলাইয়ের পরও কীভাবে আওয়ামী সমর্থকেরা এমন দুঃসাহস দেখানোর সুযোগ পায়? আদতে এই সুযোগ আমরা নিজেরাই তৈরি করে দিয়েছি। জুলাইয়ের অংশীদারেরা আজ কয়েক ভাগে বিভক্ত এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত। এই বিভক্তির সুযোগ নিয়েই মাফিয়া হাসিনা দেশ দখলের চক্রান্ত করছে।
এভাবে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্র আমরা নিজেরাই প্রস্তুত করছি। বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর হাবভাব দেখলে মনে হয়, তারা হাসিনার নির্মম শাসনের কথা ভুলে গেছে। হাসিনার আমলে যারা ধানক্ষেতে লুকিয়ে রাত কাটিয়েছে, তাদের আজ বাগাড়ম্বরের সীমা নেই। এরা এখনো বুঝতে পারছে না যে, হাসিনা ফিরে এলে বিএনপির অস্তিত্বই সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বে। আবার এনসিপি নেতাদের আচরণেও কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বশীলতা দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ সাধারণ মানুষের কাতার থেকে নিজেদের 'এলিট শ্রেণীতে' উন্নীত করেছে; জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তাদের ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো। জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু ভারসাম্য থাকলেও তাদের কিছু নেতাকর্মী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ও বিতর্কের কারণে দলটির গায়ে নেতিবাচক তকমা জুড়ছে। আসল কাজের কাজ কমই হচ্ছে, কেবল একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে।
এভাবে চলতে থাকলে বাংলার আকাশে যে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসবে, তা সরাতে হয়তো আরও একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন হবে। অথচ জুলাইয়ের অংশীদারদের উচিত ছিলো ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ঠেকানো। সরকারের উচিত ফাঁকা বুলি না আওড়িয়ে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করা এবং হাসিনার ফাঁসির রায় কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টসহ বিশ্ববিদ্যালয়, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসনের যেসব ব্যক্তি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর ছিল, তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে—যাতে হাসিনার পুনর্বাসনের কথা ভাবার দুঃসাহসও কেউ না পায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে যে, জুলাইয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা না গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি-ই। কারণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সরকার হলো বিএনপি সরকার। রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান সংস্কার এবং জুলাইয়ের দাবি পূরণ করা না গেলে এই ব্যর্থতার পুরো দায় বিএনপির ওপরই বর্তাবে। জনগণের কাছে তখন বিএনপি একটি বিশ্বাসঘাতক দল হিসেবে পরিগণিত হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন:








