বুধবার

৩ জুন, ২০২৬ ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ধর্ষণ দমনে শরিয়া আইন এবং অপরাধের মনস্তত্ত্ব

মাহতাব মুহাম্মদ, কলামিস্ট ও গবেষক

প্রকাশিত: ৩ জুন, ২০২৬ ১৫:৫৪

আপডেট: ৩ জুন, ২০২৬ ১৫:৫৫

শেয়ার

ধর্ষণ দমনে শরিয়া আইন এবং অপরাধের মনস্তত্ত্ব
ছবি মাহতাব মুহাম্মদ

ইসলামী আইনশাস্ত্রে ধর্ষণ শুধু একটি যৌন অপরাধ নয়, এটি একই সঙ্গে আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন এবং মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তাই শরীয়াহতে ধর্ষণের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর এবং অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে নির্ধারিত হয়েছে।এক. ইসলামী ফিকহে ধর্ষণকে মূলত জোরপূর্বক ‘জিনা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অপরাধী বিবাহিত হলে তার শাস্তি ‘রজম’ বা পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড এবং অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন। (সূত্র: সূরা আন-নূর, আয়াত: ২, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪২৬৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৬৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)। দুই. হিরাবাহ বা সন্ত্রাসী অপরাধ হিসেবে ধর্ষণ।মালেকী মাযহাবের ইমাম, ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.)-সহ বহু তাত্ত্বিক ফকীহর মতে, ধর্ষণ শুধু জোরপূর্বক জিনা নয়, বরং ‘হিরাবাহ’ বা সন্ত্রাসী অপরাধ। বিশেষত অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, অপহরণ করে বা জিম্মি অবস্থায় সংঘটিত ধর্ষণকে তারা ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ বা সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। কুরআনের সূরা মায়িদার ৩৩ নম্বর আয়াতে এ ধরনের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। হানাফী মাযহাবের ইমাম শামসুল আইম্মা আস-সারাখসী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-মাবসুত'-এ লিখেছেন—জোরপূর্বক জিনা (ধর্ষণ) প্রমাণিত হলে অপরাধীর ওপর হদ্দ (মৃত্যুদণ্ড বা চাবুক) ওয়াজিব হবে এবং নারীটি নির্দোষ ও ক্ষমাপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবে।(সূত্র: আল-মাবসুত, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৫৮, আরবি সংস্করণ, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, লেবানন)। মালেকী মাযহাবের ইমাম সাহনুন বর্ণিত 'আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা'-তে উল্লেখ আছে, "যে ব্যক্তি কোনো নারীর ওপর চড়াও হয়ে তাকে নির্জন স্থানে বা বাড়ির ভেতরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে, সে 'মুহারিব' (সন্ত্রাসী)। সুলতান বা বিচারক তার ওপর হিরাবাহর শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) কার্যকর করবেন।" (সূত্র: আল-মুদাওয়ানাহ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪১১, আরবি সংস্করণ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন)। শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী তাঁর 'কিতাবুল উম্ম'-এ লিখেছেন, "যদি কোনো পুরুষ কোনো মুক্ত নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে, তবে তার ওপর হদ্দ প্রযোজ্য হবে এবং তাকে ওই নারীর 'মাহরুল মিসল' (অনুরূপ মহর) দিতে বাধ্য করা হবে।" (সূত্র: কিতাবুল উম্ম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২০৩, দারুল মা'রিফাহ, বৈরুত, লেবানন, আরবি সংস্করণ)। হাম্বলী মাযহাবের ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মাকদিসী তাঁর বিখ্যাত ফিকহ বিশ্বকোষ 'আল-মুগনী'-তে লিখেছেন, "যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীকে ধর্ষণের ওপর বাধ্য করে, তবে ভুক্তভোগীর ওপর কোনো হদ্দ বা শাস্তি নেই; বরং অপরাধীর ওপর হদ্দ কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি তার সম্পত্তি থেকে উক্ত নারীর সম্মানহানি করার কারণে ‘মাহরুল মিসল’ বা সমপরিমাণ মহর জরিমানা হিসেবে প্রদান করা বাধ্যতামূলক।" (সূত্র: আল-মুগনী, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৩৩৮-৩৩৯, আরবি সংস্করণ, দারু আলিমিল কুতুব, রিয়াদ, সৌদি আরব)। সুতরাং সকল ইসলামি পণ্ডিতের সর্বসম্মতিক্রমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষক অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন, সেই সঙ্গে ধর্ষিতা নারীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও অনেক পণ্ডিত বলেছেন।

ইসলামী দণ্ডবিধিতে শাস্তি প্রধানত দুই ধরনের—‘হদ্দ’ ও ‘তাযীর’। হদ্দ হলো সেই শাস্তি, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুনির্ধারিত এবং যার ক্ষেত্রে বিচারকের অন্য সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই। অপরদিকে তাযীর হলো এমন শাস্তি, যার ধরন ও মাত্রা বিচারক অপরাধের ভয়াবহতা, প্রমাণ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করতে পারেন। হদ্দ শাস্তি অত্যন্ত কঠোর, তাই অপরাধ প্রমাণ করতেও কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যাতে নিরপরাধ কেউ সাজা না পায়। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য ইসলামে তিনটি পদ্ধতি রয়েছে: ১. চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। ২. ধর্ষকের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে। ৩. ডিএনএ টেস্ট, ফরেনসিক ও ডাক্তারি পরীক্ষা, অকাট্য ডিজিটাল আলামতসহ পারিপার্শ্বিক প্রমাণের (circumstantial evidence) ভিত্তিতে। চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকলে অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষণের স্বীকারোক্তি দিলে হদ্দ শাস্তি কার্যকর করতে হবে। ধর্ষক বিবাহিত হলে রজম বা প্রকাশ্যে পাথর মেরে হত্যা এবং অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন দিতে হবে। কিন্তু যদি চারজন সাক্ষী না থাকে এবং ধর্ষকও স্বীকারোক্তি না দেয়, তবে ডিএনএ টেস্টসহ পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষণ প্রমাণিত হলে হদ্দ (রজম বা বেত্রাঘাত) কার্যকর না করে তাযীর শাস্তির আওতায় অন্য কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তাযীরের অধীনে অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ারও সুযোগ আছে। আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ফতোয়া বিশ্বকোষ 'ফতোয়ায়ে শামী'-তে স্পষ্ট লিখেছেন, "যদি অপরাধের ধরন এতটাই জঘন্য ও ভয়াবহ হয় যে তাকে হত্যা করা ছাড়া সমাজ থেকে তার অনিষ্ট দূর করা সম্ভব নয়, তবে তাযীর হিসেবেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া জায়েজ।" (সূত্র: খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা: ৬১-৬২, আরবি সংস্করণ, দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন)। তাছাড়া ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.) তাঁর বিখ্যাত আইনি গ্রন্থ ‘আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ ফিস সিয়াসাতিল শারইয়্যাহ’ (পৃষ্ঠা: ১০৩-১০৫, আরবি সংস্করণ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন)-এ প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামের খলীফাগণ চাক্ষুষ সাক্ষী ছাড়াও নারীর পোশাকে বা শরীরে লেগে থাকা বীর্য কিংবা অন্য কোনো অকাট্য আলামত দেখে ধর্ষককে শনাক্ত করে ‘তাযীর’ এর অধীনে কঠোর শাস্তি দিয়েছেন। বর্তমান যুগের ডিএনএ টেস্ট ও সিসিটিভি ফুটেজ হলো সেই অকাট্য আলামতের আধুনিক রূপ।সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড ‘আল-লিজনা আদ-দাইমাহ’-এর এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে: “অপহরণ বা জিম্মি করে ধর্ষণ প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হবে তাযীর হিসেবে মৃত্যুদণ্ড।” (সূত্র: ফাতাওয়াল লিজনা আদ-দাইমাহ, খণ্ড: ২১, পৃষ্ঠা: ১০২, ফতোয়া নং: ১৬২৩৩, দারুল আসিমাহ, রিয়াদ, সৌদি আরব সংস্করণ)। এছাড়া ওআইসি (OIC)-র অধীনস্থ ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি' রেজোলিউশন নম্বর ৮১ (৮/৪)-এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মত দিয়েছে যে, মানবতাবিরোধী ও সামাজিক শান্তি বিনষ্টকারী অপরাধের ক্ষেত্রে, অপরাধ প্রমাণে চাক্ষুষ সাক্ষী না থাকলেও আধুনিক ফরেনসিক প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা বিচারক জনস্বার্থে অপরাধীকে ‘তাযীরান ক্বাতল’ বা মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন।এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চারজন সাক্ষী না থাকলে ধর্ষিতা নারীকে শাস্তি দেওয়া হবে—এ ধারণার শরীয়াহভিত্তিক কোনো ভিত্তি নেই। ইসলামি আইন অনুযায়ী ধর্ষণের শিকার নারী একজন ‘মজলুম’ বা নির্যাতিত ব্যক্তি। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে ভিন্ন বিষয়, কিন্তু কেবল সাক্ষীর অভাবে তাকে শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। কেননা সাক্ষী ছাড়াও আধুনিক ফরেনসিক প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষণ প্রমাণিত হতে পারে। একইভাবে “অবিবাহিত ধর্ষক কেবল ১০০ বেত্রাঘাত পেয়েই পার পেয়ে যায়”—এ অভিযোগও শরীয়াহর আংশিক ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন। কারণ অধিকাংশ ধর্ষণের সঙ্গেই ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি, অপহরণ অথবা সন্ত্রাসী উপাদান জড়িত থাকে, যা হিরাবাহ বা তাযীরের আওতায় আরও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। ফলে বিচারক অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন—হোক সে অবিবাহিত কিংবা বিবাহিত।

শরীয়াহর দণ্ডবিধিকে অনেকেই “মধ্যযুগীয়” বলে সমালোচনা করেন। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ দমন। কোনো আইন অপরাধ কমাতে কার্যকর হলে, তা কোন যুগে প্রবর্তিত হয়েছে—সেটা খুঁজতে যাওয়া অজ্ঞতা। বরং মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সেটি সমাজকে কতটা নিরাপদ করতে পারছে। "মধ্যযুগীয় আইন বলে সেটি ভালো নয়"—এমন ধারণা একটি কুযুক্তি। বিভিন্ন বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আধুনিক সেক্যুলার আইন বা পশ্চিমা আইনি কাঠামো অনুসরণকারী উন্নত দেশগুলোতে যেখানে ধর্ষণ কিংবা অপরাধের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি, সেখানে শরীয়া আইন ও দৃষ্টান্তমূলক প্রকাশ্য দণ্ডবিধি কার্যকর থাকার কারণে সৌদি আরবসহ অনেক মুসলিম দেশে অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম। এসব দেশে অপরাধের হার আন্ডাররিপোর্টিং (কম প্রতিবেদন) থাকার বিষয়টি তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও, তা মূল পরিসংখ্যানে আকাশ-পাতাল ব্যবধান সৃষ্টি করার মতো নয়। “Role of Shariah Law in Deterring Criminality in Saudi Arabia” শীর্ষক গবেষণাতে বলা হয়েছে যে, শরীয়া আইনের কঠোর শাস্তি অপরাধ প্রতিরোধে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ (deterrence) তৈরি করে। মার্কিন Department of Justice-এর NCJRS আর্কাইভে থাকা “Religious Training as a Method of Social Control” গবেষণায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবে তুলনামূলক কম অপরাধহারের পেছনে শরীয়া আইন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ একত্রে কাজ করেছে। এগুলো ছাড়াও “Islamic Law and Crime: The Case of Saudi Arabia” এবং “Effect of Islamic Legislation on Crime Prevention in Saudi Arabia”-এর মতো আরও অনেক গবেষণাপত্রে শরীয়া আইনের কার্যকারিতাকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

স্থায়ী ঠিকানা

মাহতাব মুহাম্মদ

C/O: মো. আব্দুল মোতালেব

গ্রাম: দাতপাড়া

ডাকঘর: সেওয়াইল

থানা: মির্জাপুর

জেলা: টাঙ্গাইল

মোবা: 01760972357

ইমেইল: [email protected]



banner close
banner close