দেশের রাজনীতির মাঠ থেকে এক দুর্বৃত্তের চিরবিদায় ঘটল। মৃত্যু মানুষকে সাধারণত শ্রদ্ধার আসনে বসায়, কিন্তু কিছু মানুষের বিদায় কেবল ঘৃণা ও ধিক্কারই প্রাপ্য। একজন ভালো মানুষ মারা গেলে সবাই ব্যথিত হয়, কিন্তু তোফায়েল আহমেদের মতো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের বিদায়কে আমি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক কলঙ্কমুক্তির ঘটনা হিসেবে দেখছি।
শেখ হাসিনাকে একনায়ক ও নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী হিসেবে গড়ে তোলার নেপথ্যের প্রধান কারিগর ছিলেন এই তোফায়েল আহমেদ। তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল কেবল নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা; আর এজন্য তিনি যেকোনো পর্যায়ের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে দ্বিধা করেননি।
ইতিহাসের পাতায় দাগ কাটা এক জঘন্য অপরাধের সাক্ষী ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার পৈশাচিক ঘটনায় তোফায়েল আহমেদ এবং হাসানুল হক ইনুর সরাসরি অংশগ্রহণের কথা আজ আর কারও অজানা নয়। শহীদ আব্দুল মালেকের 'অপরাধ' ছিল—তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) আয়োজিত এক সেমিনারে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা। সেমিনারের পর হলে ফেরার পথে রাস্তায় একা পেয়ে তোফায়েল আহমেদ, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননের মতো তৎকালীন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তার ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে আব্দুল মালেক প্রাণ হারান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম রাজনৈতিক ছাত্র হত্যাকাণ্ড, যা তখন পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকসু নির্বাচনে তোফায়েলদের ছাত্রলীগের ভরাডুবি ঘটেছিল।
গত পাঁচ দশকে তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশকে আসলে কী উপহার দিয়েছেন? তিনি যখনই যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তা দুর্নীতি ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থাকে পঙ্গু করা- সবখানেই তার দীর্ঘ ছায়া ছিল। শেখ হাসিনাকে আজ যে খুনি, স্বৈরাচারী ফেরাউন হিসেবে বিশ্ব চেনে, তার রাজনৈতিক ইন্ধনদাতা ও পরামর্শক হিসেবে তোফায়েল আহমেদের নাম ইতিহাসের কালো পাতায় খোদাই করা থাকবে। তিনি নিজের আখের গোছাতে গিয়ে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছেন, মেধাবীদের কণ্ঠরোধ করেছেন এবং রাজনীতির পরিবেশকে পচিয়ে দুর্গন্ধময় করে তুলেছেন।
তার মৃত্যুতে কোনো অশ্রু বা শোকের প্রয়োজন নেই। একজন খুনি ও স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে তিনি যে কলঙ্কিত ইতিহাস রেখে গেছেন, তা কোনোদিন মুছে যাবে না। তার অপকর্মের বিচারের ভার এখন জনগণের আদালত এবং ইতিহাসের ওপর ন্যস্ত। আজকের এই বিদায় কোনো শোক নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক অভিশপ্ত অধ্যায়ের অবসান।
শহীদ আব্দুল মালেককে আজ আবারও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
লেখক পরিচিতি:
মো. রেযাউল করিম
গবেষক- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (২০০৫-২১)
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন:








