মঙ্গলবার

৯ জুন, ২০২৬ ২৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

অসাধু উপায়ে কুরবানীর পশু মোটাতাজাকরণে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মুহাম্মাদ আছিম বিল্লাহ আযহারী

প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২৬ ১৬:৫১

শেয়ার

অসাধু উপায়ে কুরবানীর পশু মোটাতাজাকরণে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ছবি: মুহাম্মাদ আছিম বিল্লাহ আযহারী

কুরবানী মুসলিম উম্মাহর এক মহান ইবাদত; যা কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাকওয়া এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ

“আল্লাহর নিকট পৌঁছে না এসব পশুর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”

— (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)

আজকাল কুরবানীর ঈদকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত অধিক মুনাফার আশায় পশুকে অস্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা করতে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করে থাকে। যেমন— স্টেরয়েড, হরমোন ইনজেকশন, পানি ও লবণ পুশ করা, ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্য ইত্যাদি। এতে বাহ্যিকভাবে পশু মোটা ও আকর্ষণীয় দেখালেও বাস্তবে তা পশুর জন্য কষ্টদায়ক, ভোক্তার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যবসায়িক প্রতারণার শামিল।

ইসলাম ব্যবসায় সততা ও স্বচ্ছতাকে অপরিহার্য করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنَّا

“যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”

অতএব যদি কেউ জেনেশুনে পশুর প্রকৃত অবস্থা গোপন করে, কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে, তবে তা স্পষ্ট প্রতারণা; যা শরীয়তে হারাম তথা অবৈধ।

আরও ভয়াবহ দিক হলো— এ ধরনের কেমিক্যাল বা ইনজেকশনের কারণে পশু কষ্ট পায়। ইসলাম প্রাণীর প্রতিও দয়া ও সদাচরণের শিক্ষা দিয়েছে। নবী ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর উপর ইহসান (সুন্দর আচরণ ও উত্তম পদ্ধতি) আবশ্যক করেছেন। অতএব যখন তোমরা (যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকেও) প্রয়োজনে হত্যা করবে, তখন উত্তমভাবে হত্যা করো; আর যখন জবাই করবে, তখন সুন্দরভাবে জবাই করো। তোমাদের কেউ যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।”

পশুকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দিয়ে, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে, শুধু বাজারমূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগ করা এই ইহসানের পরিপন্থী।

ইসলামী ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

“নিজে ক্ষতি করা যাবে না, অন্যকেও ক্ষতি করা যাবে না।”

অসাধু মোটাতাজাকরণে তিনটি ক্ষতি একসঙ্গে সংঘটিত হয়—

১)পশুর ওপর জুলুম;

২) ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা;

৩) মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি।

তবে স্বাভাবিক উপায়ে পুষ্টিকর খাদ্য, পরিচর্যা, পরিষ্কার পরিবেশ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করা সম্পূর্ণ বৈধ; বরং এটি প্রশংসনীয়।

সমস্যা তখনই, যখন দ্রুত মুনাফার লোভে হারাম ও ক্ষতিকর পন্থা অবলম্বন করা হয়।

সুতরাং কুরবানীকে ব্যবসায়িক প্রতারণার উৎসে পরিণত না করে ইবাদতের পবিত্রতা রক্ষা করা জরুরি। বিক্রেতাদের মনে রাখতে হবে— দুনিয়ার বাজারে কিছু লাভের জন্য আখিরাতের ক্ষতি কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আর ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে, যেন বাহ্যিক চাকচিক্যে প্রতারিত না হোন।

মোটকথা, কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আল্লাহর আনুগত্য, ত্যাগ, তাকওয়া এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা। যে ইবাদতের মূলেই আছে আত্মসমর্পণ ও ইখলাস, সেখানে প্রতারণা, লোভ ও নিষ্ঠুরতার কোনো স্থান নেই। তাই কুরবানির প্রকৃত চেতনা হলো—নিজের প্রবৃত্তিকে সংযত করা, হালাল-হারামের সীমারেখা রক্ষা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে দুনিয়াবি লাভের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।

কুরবানি আমাদের শেখায়—ছুরির নিচে শুধু পশু নয়, নত হতে হবে লোভ, স্বার্থপরতা ও অসততাকেও।

আল্লাহ আমাদের ব্যবসায় সততা, কুরবানীতে ইখলাস এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে হালাল-হারামের বোধ দান করুন, আমীন।

লেখক, মুহাম্মাদ আছিম বিল্লাহ আযহারী

শিক্ষা সচিব : জামিয়া আরাবিয়া জায়েদা মঙ্গল ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

অনার্স ও মাস্টার্স : আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় মিশর।



banner close
banner close