বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিত্ব ও নাজুক সরকারপ্রধান হিসেবে জনাব তারেক রহমান এর নাম এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। জাতীয় নির্বাচনের আগেই এর স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। ডাকসুর ভিপি সাদেক কায়েম এবং জামায়াত প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁকে প্রকাশ্যে নির্বাচনী বিতর্কে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কেন সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন নি—আজ তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করার ন্যূনতম সাহসও যার নেই, তার নেতৃত্ব কতটা ভঙ্গুর—তা এখন আর গোপন নয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে জনগণের মধ্যে যে জনপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া- তা ফলাফল ঘোষণার পরপরই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ভারতীয় প্রভাব ও দেশীয় “ডিপ স্টেট”- যার মধ্যে আমলাতন্ত্র বিশেষ করে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার দায়িত্বে থাকা প্রশাসন ক্যাডার, সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআই এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এর নেতৃত্বাধীন গণমাধ্যম চক্র—সম্মিলিতভাবে জনগণের দেওয়া ভূমিধস রায়কে কীভাবে পাল্টে দিয়েছে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রাজনীতিতে দেশি-বিদেশি “ডিপ স্টেট” খেল কোনো কল্পকাহিনী নয়; এটি বহু দেশের চরম বাস্তবতা। এমন এক অদৃশ্য কাঠামো, যেখানে নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও কিছু শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে। ফলে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ অন্যত্র সরে যায়। পাকিস্তানে জনগণের ভোটে জয়ী হয়েও ইমরান খান কারাগারে, আর পরাজিত শক্তি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাষ্ট্রক্ষমতায়—এমন উদাহরণ অনেকের কাছেই পরিচিত। বাংলাদেশেও অনেকে মনে করছেন, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও অনুরূপ একটি চিত্র তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, নেপাল-এ জেন-জি সমর্থিত নতুন নেতৃত্বের উত্থান একটি ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেখিয়েছেন—সাহসী নেতৃত্ব থাকলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।
একইভাবে শ্রীলঙ্কাতেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতি ও প্রশাসনে সংস্কারের চেষ্টা দেখা গেছে। গভীর সংকটের মধ্যেও তারা পুনর্গঠনের পথে হাঁটার চেষ্টা করছে—যা প্রমাণ করে, সৎ ও কার্যকর নেতৃত্ব থাকলে সংকট থেকেও উত্তরণের পথ তৈরি হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল, জননিরাপত্তা অনিশ্চিত, এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্রমশ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ যে পরিবর্তনের আশায় আন্দোলন করেছে, যে আত্মত্যাগ করেছে—তার প্রত্যাশিত সুফল তারা পায়নি। জুলাইয়ের আন্দোলনে রক্তদানের পরও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ জনগণের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে গেছে বলে অনেকেই মনে করেন। পুরো পরিবর্তনের প্রক্রিয়াই যেন মাঝপথে থেমে গেছে।
ডা. শফিকুর রহমানের মতো শিক্ষিত, বিনয়ী, প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সামনে এলে দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত—এ কথা আজ অনেকের মুখেই উচ্চারিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধকে ঘিরে জ্বালানি তেলকেন্দ্রিক যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেশে তৈরি হয়েছে, তা কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে অনেক আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল। মাঠপর্যায়ের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দৃশ্যমান ফল দেখাতে পারতেন—এ নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি দুর্বল, অকার্যকর এবং সুস্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত নেতৃত্বকে সামনে এনে দেশকে এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন এখন আর শুধু ‘কে ক্ষমতায়’—তা নয়; বরং ‘কারা প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে’—সেটিই আজ সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমানের মতো নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় এলে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে—প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং জনজীবনে বাস্তব ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে কেন একটি অদক্ষ ও নির্ভরশীল নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হলো—তার উত্তর এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। এটি কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়—এটি একটি সুপরিকল্পিত বাস্তবতা, যেখানে শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্বকে সরিয়ে রেখে একটি দুর্বল কাঠামোকে টিকিয়ে রাখাই যেন মূল উদ্দেশ্য। আর এর খেসারত দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ—প্রতিদিন, প্রতিটি স্তরে।
৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লবে এত মানুষের রক্ত ঝরার পরও বাংলাদেশের মানুষ আজ যেন এক নির্মম পরিহাসের শিকার। কিন্তু ইতিহাসের একটি নির্মম সত্য আছে—বিশ্বাসঘাতকতাকে ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না। বারবার প্রমাণিত হয়েছে, জনগণের রায়কে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে টিকে থাকা যায় না। মীর জাফরদের পরিণতি ইতিহাসে স্পষ্টভাবে লেখা—এবং ভবিষ্যতেও যারা ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, তাদের জন্যও সেই পরিণতিই অবধারিত।
এখনও সময় আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে তাকে মেরুদণ্ড সোজা করে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। পর্দার আড়ালের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের সামনে আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে হবে। দৃশ্যমান কাজ, কঠোর জবাবদিহিতা এবং কার্যকর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনআস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। অন্যথায়, দল হিসেবে বিএনপিকেও এর অনেক চড়ামূল্য দিতে হতে পারে।
লেখক পরিচিতি:
মো. রেযাউল করিম
গবেষক- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (২০০৫-২১)
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন:








