মঙ্গলবার

১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১ বৈশাখ, ১৪৩৩

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তিনটি স্পষ্ট স্তর তৈরি হয়েছে: রেজাউল করিম

রেজাউল করিম

প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩:০৬

শেয়ার

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তিনটি স্পষ্ট স্তর তৈরি হয়েছে: রেজাউল করিম
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তিনটি স্পষ্ট স্তর তৈরি হয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম ক্যাডেট বা নামীদামী বেসরকারি স্কুল, আর সাধারণ সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল। এই তিন স্তরই মূলত তিন শ্রেণির মানুষের জন্য।

সিলেবাস ও মানের বৈষম্য — ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানো হয় কেমব্রিজ বা এডেক্সেল কারিকুলাম। বাংলা মিডিয়াম নামী স্কুলগুলোতে NCTB বই হলেও এক্সট্রা কোচিং, গাইড, সৃজনশীল নামে আলাদা চাপ। আর প্রান্তিক সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংকট, ল্যাব নেই, লাইব্রেরি নেই, এমনকি টয়লেটও ব্যবহারের অযোগ্য। ফলে একজন ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র ক্লাস ফাইভেই প্রেজেন্টেশন দিতে শেখে, আর গ্রামের স্কুলের ছাত্র দশম শ্রেণিতেও ইংরেজিতে একটা দরখাস্ত লিখতে ভয় পায়। চাকরির বাজারে গিয়ে এই গ্যাপটা আরও প্রকট হয়।

সামাজিক দূরত্ব ও মূল্যবোধের কৃত্রিম সংকট — যখন ধনীর সন্তান স্কলাসটিকা বা সানবিমে পড়ে আর গরিবের সন্তান টিনশেড প্রাইমারিতে পড়ে, তখন তারা দুইটা আলাদা বাংলাদেশ দেখে বড় হয়। একজন শেখে উইকেন্ডে থাইল্যান্ড ট্যুর স্বাভাবিক, আরেকজন শেখে ঈদে একটা নতুন জামা পাওয়াই বিলাসিতা। ফলে সহমর্মিতা নষ্ট হয়। নেতা-আমলার ছেলে গ্রামের বাস্তবতা বোঝে না, কারণ তার বন্ধু-সার্কেলে কোনো কৃষকের ছেলে নেই। এভাবে রাষ্ট্র চালানোর সময় নীতিনির্ধারকরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অতীত বনাম বর্তমান: হারিয়ে যাওয়া সামাজিক বন্ধনকে রক্ষা করতে হবে। একটা সময় ছিল, আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পূর্বে, যখন সকলের সন্তান একই ধরনের স্কুলে পড়াশোনা করত। সচিবের সন্তান আর পিওনের সন্তান একই বেঞ্চে বসত, একসাথে টিফিন খেত। এ কারণে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল, বোঝাপড়া ছিল, পরস্পরের সমস্যাগুলো পরস্পর জানত।

যেমন, আমি যখন স্কুল-কলেজে পড়ি, আমি আমার কোন অসহায় বা দরিদ্র বন্ধুর (ছাত্র/ছাত্রী) বিপদে খুব সহজেই তার পাশে দাঁড়াতে পারতাম; কাছ থেকে তাদের অবস্থা জানার সুযোগ হত; এমনকি তাদের কেউ বেতন-ফি দিতে না পারলে বা কোনো সমস্যায় পড়লে আমার মতো আরো অনেকই এগিয়ে আসতে পারত। তাদের কথা আমরা আমাদের ধনী বাবা বা অভিভাবকদের সরাসরি জানাতে পারতাম যে এই গরিব ছেলেটাকে সাহায্য করো। আমাদের বাবারও সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতেন। এভাবে সর্বত্রই বাংলাদেশে যারা গরিব ছিল, অসহায় ছিল, তাদের পাশে দাঁড়াত তাদেরই ধনী সহপাঠী বন্ধুরা। সমাজটা একটা সুতোয় গাঁথা ছিল।

আর আজকে ধনীরা ধনীদের সাথে চলাচল করে। যারা এলিট বা রিচ (Rich), তাদের সার্কেলটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেছে। গরিবদের সার্কেলও আলাদা। দুই শ্রেণির দেখাই হয় না, কথা তো দূরের কথা। যে কারণে ধনী-গরিবের বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিক ও সামাজিকভাবেও বাড়ছে। এই বিভাজন চলতে থাকলে ধনী চিরকাল ধনী থাকবে, গরিবরা চিরকাল গরিবই থেকে যাবে।

শিক্ষক ও অবকাঠামোয় বৈষম্য দৃশ্যমান তাও যেন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না। ঢাকার একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকের বেতন ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। আর উপজেলার সরকারি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকের বেতন ১৭ হাজার টাকা। মেধাবীরা তাই সরকারি স্কুলে পড়াতে চায় না। ফলে ভালো স্কুল আরও ভালো হয়, খারাপ স্কুল আরও খারাপ হয়। এই চক্র চলতেই থাকে।

সমাধান কী হতে পারে?

এই বৈষম্য দূর করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমান্তরাল করতে হবে। ফিনল্যান্ড, কিউবার মতো দেশে প্রাইভেট স্কুল নেই বা খুবই সীমিত। সেখানে মন্ত্রীর ছেলেও পাশের সরকারি স্কুলে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র বাধ্য হয় সরকারি স্কুলের মান ভালো রাখতে।

বাংলাদেশে ধাপে ধাপে করা যায়:

- সব স্কুলে একই কারিকুলাম, একই মানের ল্যাব, লাইব্রেরি, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত বাধ্যতামূলক করা

- সরকারি কর্মকর্তা, এমপি-মন্ত্রীদের সন্তানদের নিজ কর্মস্থলের জেলার সরকারি স্কুলে পড়া বাধ্যতামূলক করা

- শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৬% করা এবং তার ৮০% প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সরকারি স্কুলে দেওয়া

- শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া

শিক্ষা যদি পণ্য হয়ে যায়, তাহলে দেশটাও দুই ভাগ হয়ে যাবে। একটা বাংলাদেশ হবে গুলশান-বনানীর, আরেকটা হবে রহিমপুর-করিমপুরের। এই বিভাজন ঠেকাতে শিক্ষায় সমতা আনা ছাড়া উপায় নেই।

রেজাউল করিম

লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক

(রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক)



banner close
banner close