গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’—এটি কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আইন, নাকি জনগণের সাথে তারেক রহমানের সরকারের নির্মম উপহাস ও তামাশা?
যেখানে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে ৫–৬ লাখ টাকা লুট করা হচ্ছে, সেখানে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকার জরিমানা কোনো শাস্তি নয়—এটি দুর্নীতির জন্য প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স। অর্থাৎ, যত খুশি লুট করুন; ধরা পড়লে সামান্য জরিমানা দিয়ে আবার ব্যবসা চালিয়ে যান!
এই আইন দুর্নীতি বন্ধ করবে না—বরং দুর্নীতিকে আরও নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক করে তুলবে; কারণ, বাস্তবতা আরও নির্মম। মালয়েশিয়াগামী একজন বাংলাদেশি কর্মীর কাছ থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৫–৬ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে, যার মধ্যে ৪–৫ লাখ টাকাই অতিরিক্ত। অথচ একই কাজের জন্য একজন নেপালি বা ভারতীয় শ্রমিকের খরচ সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা। এই লজ্জাজনক বৈষম্য কোনো গোপন বিষয় নয়—২০১৬ সাল থেকেই প্রকাশ্যে চলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই দীর্ঘদিনের লুটপাট কি রাষ্ট্রের অজানা? নাকি এটি একটি নীরব অনুমোদিত ব্যবস্থা?
মালয়েশিয়া সরকার একাধিকবার এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিলেও বাংলাদেশ থেকে একটি প্রভাবশালী চক্র বারবার সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে—এই চক্রে জড়িত প্রভাবশালী জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অংশবিশেষ, এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সচিব-এমপি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। অর্থাৎ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক শোষণব্যবস্থা, যা বছরের পর বছর ধরে সরকারি ছত্রছায়ায় টিকে আছে।
এই বাস্তবতায় ২ লাখ টাকার জরিমানা কার্যত একটি প্রহসন। এটি দুর্নীতি দমন করে না; বরং দুর্নীতিকে নিরাপদ ও টেকসই করে তোলে। এই আইনের মাধ্যমে অসাধু এজেন্সিগুলোর জন্য বার্তা স্পষ্ট—“লুটপাট চালিয়ে যান, ঝুঁকি খুবই কম।”
এই চিত্র কোনো আবেগনির্ভর অভিযোগ নয়। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান International Anti-Corruption Academy (IACA)-এ প্রকাশিত আমার গবেষণায় (২০১৭) এই সিন্ডিকেটভিত্তিক শোষণের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে:
https://www.iaca.int/media/attachments/2020/01/08/rezaul_karim_masters_thesis_2017.pdf
সবচেয়ে করুণ সত্য হলো—এই শোষণের শিকার হচ্ছেন সেই মানুষগুলো, যাদের আমরা “রেমিটেন্স যোদ্ধা” বলে সম্মান করি। তারা জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে বিদেশ যায়, তারপর বছরের পর বছর ঋণের বোঝা বইতে থাকে। তাদের ঘাম ও রক্তে দেশের অর্থনীতি সচল, অথচ তাদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র প্রায় অনুপস্থিত।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক (’বিকাশ নূর’)-এর নেতৃত্বে প্রণীত এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একইসঙ্গে, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব—যেমন তারেক রহমান—এর কাছেও এখন স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত: তারা কি এই দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বাস্তব পদক্ষেপ নেবেন, নাকি এই শোষণই চলতে থাকবে?
সুপারিশ
১. জরিমানাকে বাস্তবসম্মত ও ভয়াবহ করা: আদায়কৃত অতিরিক্ত টাকার কমপক্ষে দ্বিগুণ জরিমানা, বাধ্যতামূলক কারাদণ্ড এবং লাইসেন্স স্থায়ী বাতিল করতে হবে।
২. সিন্ডিকেট অবলুপ্ত করতে হবে: সীমিত এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
৩. অভিবাসন খরচ নির্ধারণ ও প্রয়োগ: নির্ধারিত খরচের বাইরে এক টাকা নিলেই কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ডিজিটাল ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা: রিক্রুটমেন্টের প্রতিটি ধাপ অনলাইনে এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় আনা: রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয় কোনো ঢাল হতে পারবে না—দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিটেন্স। অথচ সেই রেমিটেন্স যোদ্ধারাই যদি সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হন, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি একটি নৈতিক বিপর্যয়। স্পষ্ট করে বলতে হয়—এই আইন বর্তমান আকারে সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে আড়াল করার একটি দুর্বল প্রচেষ্টা।
সময় এখনো আছে। রাষ্ট্র চাইলে মন্ত্রী-সংসদ সদস্য-ব্যবসায়ী ও আমলাদের নিয়ে গড়া এই শোষণচক্র ভাঙা সম্ভব। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা দিয়ে এই খাত সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
কিন্তু এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে—এই আইন জনগণের কাছে আরেকটি ‘তামাশা’ হিসেবেই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে। একইসঙ্গে সিন্ডিকেটনিয়ন্ত্রিত ভয়াবহ দুর্নীতিপূর্ণ অভিবাসন প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে ও নীরবে আগের মতোই চলতে থাকবে—আর শোষণের শিকার হবে অসহায় মানুষ।
লেখক পরিচিতি:
মো. রেযাউল করিম
গবেষক- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (২০০৫-২১)
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন:








