বুধবার

৮ এপ্রিল, ২০২৬ ২৫ চৈত্র, ১৪৩২

‘ধানক্ষেতী’ দখলদারিত্ব: এবার লক্ষ্য বাংলাদেশ ক্রিকেট!

মো. রেজাউল করিম

প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:১৪

শেয়ার

‘ধানক্ষেতী’ দখলদারিত্ব: এবার লক্ষ্য বাংলাদেশ ক্রিকেট!
লেখক মো. রেজাউল করিম

আলহামদুলিল্লাহ! জাতীয়তাবাদী ‘ধানক্ষেতী’ অভিযাত্রা এখন আর কোনো সীমারেখা মানছে না- বরং রাষ্ট্রের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, একের পর এক, যেন পরিকল্পিতভাবে কব্জায় নেয়ার এক অপ্রতিরোধ্য মিশনে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন, নীতি নির্ধারণী স্তর, বিভিন্ন সংস্থা—সবকিছুর পর এবার হাত পড়েছে দেশের সবচেয়ে আবেগঘন, সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়—বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

এটি কেবল একটি খেলার প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, গর্ব এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রশ্ন। আর সেই জায়গাটিকেই যদি দখলদারিত্বের রাজনীতির শিকার হতে হয়—তাহলে সেটি কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং গভীরভাবে বিপজ্জনক।

প্রশ্নটা এখন আর সরল নয়—এটি ভয়ংকরভাবে স্পষ্ট: বাংলাদেশের ক্রিকেট কি এখনো ক্রিকেটারদের, নাকি এটি রাজনৈতিক প্রভাব ও গোষ্ঠীগত আধিপত্যের একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে?

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)—যে প্রতিষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতীক—আজ সেটি ক্রমেই একচেটিয়া প্রভাব বলয়ের আওতায় চলে যাচ্ছে বলে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা আর গুজব নয়; এটি দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে উঠছে। ‘ধানক্ষেতী’ পরিচয়ে পরিচিত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে প্রবণতা আমরা দেখছি, তা কোনো স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদল নয়—এটি সুপরিকল্পিত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক নগ্ন প্রচেষ্টা।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক Tamim Iqbal-এর মতো একজন প্রভাবশালী ও সম্মানিত ক্রিকেটারের নামও আলোচনায় উঠে আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত করে—সমস্যাটি কেবল বোর্ডরুমে সীমাবদ্ধ নয়; এটি খেলোয়াড়দের পরিসরেও ছায়া ফেলছে।

অনেকে সহজ যুক্তি দেন—উন্নত বিশ্বেও “স্পয়েল সিস্টেম” আছে। কিন্তু এই যুক্তি আসলে বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি কৌশল মাত্র। কারণ উন্নত গণতন্ত্রে দলীয় প্রভাব থাকলেও, সেখানে প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার সংস্কৃতি নেই। সেখানে শক্তিশালী চেক অ্যান্ড ব্যালান্স, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার কাঠামো কাজ করে।

কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় যা প্রতীয়মান হচ্ছে, তা আরও উদ্বেগজনক:

👉 নিয়মকে পাশ কাটিয়ে প্রভাব বিস্তার

👉 প্রতিষ্ঠানকে দলীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার

👉 পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করে অনুগতদের প্রতিষ্ঠা

👉 এবং ভিন্নমতকে নীরব করে দিয়ে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা

সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো—ক্রিকেট কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত খেলা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) বারবার সতর্ক করেছে—সরকারি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিহাস সাক্ষী, এমন হস্তক্ষেপের কারণে একাধিক দেশের ক্রিকেট বোর্ড নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে।

তাহলে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার আর সুযোগ কোথায়? আমরা কি সেই বিপজ্জনক পথেই হাঁটছি?

আজ যারা ক্ষমতার জোরে বিসিবির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তারা কি একবারও ভাবছেন—এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কী হতে পারে? যদি আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে, যদি আইসিসি কঠোর ব্যবস্থা নেয়—তাহলে সেই দায় কে নেবে? দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী? নাকি সেই ক্ষমতালোভী সিদ্ধান্তগ্রহণকারীরা?

বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটকে ভালোবাসে—এটি তাদের আনন্দ, তাদের স্বপ্ন, তাদের একতার প্রতীক। তারা রাজনীতির নোংরা খেলা দেখতে চায় না। তারা চায় মাঠে প্রতিযোগিতা, প্রতিভা ও সততার জয়—বোর্ডরুমে ক্ষমতার দখলদারিত্ব নয়।

এখন সময় এসেছে একটি স্পষ্ট, নির্ভীক ও আপসহীন বার্তা দেওয়ার:

👉 ক্রিকেট কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়

👉 এটি একটি জাতির সম্মান, আবেগ ও পরিচয়ের প্রতীক

👉 এবং এটিকে দখল বা নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা—শুধু অনৈতিক নয়, এটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী

এই প্রবণতা যদি এখনই থামানো না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এটিকে শুধুমাত্র একটি ভুল হিসেবে দেখবে না—বরং এটি হবে একটি পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের উদাহরণ।

এখনও সময় আছে- ক্রিকেটকে রাজনীতির কবল থেকে মুক্ত করুন। প্রতিষ্ঠানকে ফিরিয়ে দিন পেশাদারিত্বের হাতে এবং দেশের সম্মানকে রক্ষা করুন।

লেখক পরিচিতি: মো. রেজাউল করিম

গবেষক- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (২০০৫-২১)

ইমেইল: [email protected]



banner close
banner close