শুক্রবার

৩ এপ্রিল, ২০২৬ ২০ চৈত্র, ১৪৩২

লে. জে. মাসুদ গ্রেফতার- ডিপ স্টেটের চক্র কি অধরাই থাকবে?

মো. রেযাউল করিম

প্রকাশিত: ৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:৫৩

শেয়ার

লে. জে. মাসুদ গ্রেফতার- ডিপ স্টেটের চক্র কি অধরাই থাকবে?
ছবি: সংগৃহীত

২০০৭-০৮ সালে বাংদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও তথাকথিত ‘দুর্নীতিবাজদের’ কাছে ত্রাস হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই গ্রেফতার কি ন্যায়বিচারের সূচনা, নাকি শুধুই একটি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ?

আক্ষেপের বিষয় হলো- মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হলেও ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৭-০৮ সালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও মাইনাস-থ্রি তথা বিরাজনীতিকরণের প্রচেষ্টার চার মাস্টারমাইন্ড এখনো পুরোপুরি আলোচনার বাইরে।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ‘ব্রেন’ বা ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে পর্দার অন্তরালে সার্বিক সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে যথাক্রমে—টিআইবি’র আজীবন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, প্রথম আলোর মতিউর রহমান, ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম এবং সিসিডির ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে। তথাকথিত সুশীল এবং দেশের অভ্যন্তরীণ এস্টাবলিশমেন্টের শক্তিশালী এই চারচক্র জেনারেল মাসুদ-মইন জুটির সক্রিয় ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে কাজ করেছে।

এরাই সংগবদ্ধভাবে দেশকে ডিপলিটিসাইজ করার জন্য জেনারেল মাসুদ ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনকে সার্বিকভাবে গাইড করেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। টিআইবি’র তখনকার গবেষক ও ড. ইফতেখারুজ্জামানের সহকর্মী হিসেবে আমি এসব কর্মকাণ্ড খুব কাছ থেকেই দেখেছি। তবে ওই চার-চক্রের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। এই কয়জন কি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হলো, কিন্তু তথাকথিত এই ডিপ স্টেটের নেপথ্য চক্র, যারা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তারা কি আবারও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে? এই গ্রেফতার কি একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সূচনা, নাকি কেবল একজন ব্যক্তিকে সামনে রেখে বৃহত্তর কাঠামোকে আড়াল করার আরেকটি প্রচেষ্টা?

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমান গ্রেফতারটি মানবপাচারের মামলায়। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ের গুরুতর অভিযোগগুলো—গুম, নির্যাতন, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, সম্পত্তি দখল—এসবের কি আলাদা ও গভীর তদন্ত হবে? এই মাসুদ চৌধুরীই ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে দেশে সেনা শাসন কায়েমে নেতৃত্বদানকারী।

ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে সারাদেশে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী ও তথাকথিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যে ভয়ঙ্কর ও নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তার প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন গ্রেফতারকৃত মাসুদ চৌধুরী। ‘ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি’র অধীনে পরিচালিত গুরুতর অপরাধবিষয়ক ওই অভিযানের সময় কমপক্ষে তিন শতাধিক মানুষ হত্যা, গুম ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ ও দালিলিক প্রমাণ রয়েছে; যার দায় মাসুদ চৌধুরী এড়াতে পারেন না।

জিয়া পরিবারই এই মইন-মাসুদদের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিল অপ্রত্যাশিত গতিতে; আর বিনিময়ে পুরো জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করাসহ তারেক রহমানকে প্রায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। জেনারেল মাসুদের নির্দেশেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। দু’হাতে রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রশি খুলে তারেক রহমান ঝুলন্ত অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদরত সেনাকর্মকর্তার টেবিলের কোনায় মেরুদণ্ডে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে তাকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসা না করালে তিনি হয়তো আজীবনের জন্য সজ্জাশায়ী থাকতেন। অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমি এই গবেষণাটি (টিআইবি প্রতিবেদন, www.tibangladesh.org/images/max_file/rp_fr_army_role_armed_forces_caretaker_gov_full_report_bn.pdf) পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মুখ থেকে তারেক রহমানের ওপর ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিবরণ শুনেছি। তবে, টিআইবি’র প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে ও চাপের মুখে মাঠপর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্যের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্রের সামান্যতম অংশই তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া সে সময় বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমসহ বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মী আটকের পর গুম বা নিখোঁজ হন। রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীদের মৃত্যুর ঘটনাও সেই সময়ের বিতর্কিত ঘটনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সারাদেশে বড় বড় ব্যবসায়ীদেরকে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন টাস্কফোর্সের অধীনে আটক ও নির্যাতন করে বন্দুকের মুখে জোর করে মুচলেকা নিয়ে জোরপূর্বক আদায় করা টাকার মধ্যে মাত্র ১,২৩২ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হয় (টিআইবি প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ১৩)। বাস্তবে তার কয়গুণ সংশ্লিষ্ট সেনাসদস্যরা আত্মসাৎ করেছে—সেটা আপনারাই ধারণা করে নিন। আর পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল অসাংবিধানিক।

বাংলাদেশের জনগণ আজ একটি স্পষ্ট উত্তর জানতে চায়—কে সেই শক্তি, যারা বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্রবাহিনীকে ব্যবহার করে দমন-পীড়নের পরিবেশ তৈরি করেছিল? কে সেই গোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রায় ধ্বংস করেছিল? এবং সেই সময়ের ঘটনাগুলোর দায়ভার কে নেবে?

ন্যায়বিচার কখনো আংশিক হতে পারে না। একজন মাসুদ চৌধুরীকে বিচারের মুখোমুখি করা আর পুরো কাঠামোকে জবাবদিহির আওতায় আনা—এ দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

যদি সত্যিই বিচার করতে হয়, তাহলে শুধু মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নয়; বরং এই পুরো ডিপ স্টেট কাঠামো, সামরিক ও বেসামরিক উভয় স্তরের সংশ্লিষ্ট সকল প্রভাবশালীদের ভূমিকাও তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। এতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিও বহুগুণে উজ্জ্বল হবে।

লেখক পরিচিতি:

গবেষক- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (২০০৫-২১)

ইমেইল: [email protected]



banner close
banner close