রমজানের রোজা আত্মশুদ্ধি শিক্ষা দেয়। আর ঈদ সেই আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও সংযমের উত্তম পুরস্কার। তাই ঈদের দিন শুধু আনন্দে আত্মত্যাগ ও সংযমের মেতে ওঠা নয়; বরং আত্মদান, যাকাত প্রদান, ভ্রাতৃত্ব স্থাপন ও বিশ্বমানবতার প্রতি প্রেম প্রদর্শনই প্রকৃত কর্তব্য। কাজী নজরুল ঈদের এই গানটিতে ‘মন’-কে সম্বোধন করে আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ এটি বাহ্যিক নির্দেশ নয়, অন্তরের জাগরণ। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উদযাপন প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য অসাধারণ অনুভূতি। তাই রমজানের রোজার শেষে ঈদের খুশির দিনে মানুষের প্রতি মমত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। আত্মত্যাগের মাধ্যমেই মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি সম্ভব। এসব মহান আল্লাহরই অলংঘ্যনীয় নির্দেশ। অর্থ-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব, সোনা-দানা, রাজ-রাজত্ব, বালাখানা সব আল্লাহর রাহে কুরবানী করতে হবে। এখনকার মুসলিম জাতির বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের মূল সমস্যা হলো যথাযথভাবে যাকাত দেন না। কবির ভাষায়- যারা যাকাত দেন না তারা মুর্দা। অতএব যাকাতের বিধান সমাজ রাষ্ট্রে কায়েম করে মুসলিমের ঘুম ভাঙানোর প্রতি জোর দিয়েছেন কবি। আজ যে পবিত্র ঈদগাহে মুসলিমগণ নামাজ আদায় করবে সেই ঈদগাহে একদিন কাফির মুশরিকগণ পুজা-অর্চনা করতেন। এই স্বাধীন জমিন ও পবিত্র ঈদগাহের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ধর্মযুদ্ধের সকরুণ ইতিহাস। সেই পবিত্র যুদ্ধে অনেকেই হয়েছেন শহীদ। আবার অনেকেই হয়েছেন-গাজী।
যুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করেই কবি আবার শান্তির কথা বলতে ভুলে যাননি। পরের চরণেই কবি বলেছেন-‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,/ তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ’। অর্থাৎ ইসলাম অর্থ শান্তি। কোনক্রমেই কেউ ভুল না করেন। এজন্যই কবি সচেতনভাবে বললেন, দোস্ত-দুশমন ভুলে যেতে। যুদ্ধ নয়। প্রেম দিয়েই বিশ্বকে ইসলামে দীক্ষিত করার তাগিদ দিয়েছেন। গরীব-দুঃখী, নিত্য-উপবাসী ও অসহায়, ইয়াতিম-মিসকিনকে তিনি দান করার কথা তুলে ধরেছেন। হৃদয়ে তৌহিদী বিশ্বাস লালনের মাধ্যমেই নবী মোহাম্মদ-এর ভালোবাসা ও শাফায়াত পেয়ে ধন্য হবেন মুসলিমগণ। শুধু যুদ্ধ যুদ্ধ নয়। ক্ষমা ও মাহাত্মই ছিলো মহানবীর মূল আদর্শ। এই কারণেই কবি নজরুলও বিখ্যাত এই গানের শেষ দুই চরণ ক্ষমা ও মহৎ কাজের অনুপ্রেরণায় শেষ করেছেন। কবির ভাষায়-‘তোরে/ মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা, সেই/ পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ’।
প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম রচিত ‘নজরুল নির্দেশিকা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে- ‘৩ অক্টোবর ১৯৩২ সালে প্রকাশিত জুলফিকার (গানের সংকলন) সংগীতগ্রন্থে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়।’
কাজী নজরুল ইসলামের অমর ইসলামি সংগীত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে এক অনন্য সৃষ্টি। গানটি সৃষ্টির পর থেকে অদ্যাবধি এমন দ্বিতীয় একটি গান রচনা কারও পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এমন কি এই গানের কাছাকাছি একটি গানও সৃষ্টি হয়নি। বলাবাহুল্য গান-কবিতার লেখক মাত্রই বিশেষত গীতিকবিগণের মনের গহীনের অন্যতম প্রত্যাশাই থাকে, ‘আহ্, এমন একটি গান যদি আমিও লিখতে পারতাম!’ গানটির বাণী সুমিষ্ট কথামালার অনন্য উৎস। সুচয়িত শব্দাবলি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিক ঘটনাসম্বলিত। মুসলিম জাতির ইতিহাস সমৃদ্ধ। এছাড়াও বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপট অনুযায়ী অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনামূলক এবং প্রবল সাহস উৎপাদক ও উৎসাহ ব্যঞ্জক। বস্তুত এই গানটিতে মুসলিম সমাজের আত্মশুদ্ধি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগের বাণী বহনকারী চিরন্তন আহ্বান বিধৃত।
লেখক: ড. হাফিজ রহমান
আরও পড়ুন:








