একটি ভিডিও। দৈর্ঘ্য মাত্র ১৯ সেকেন্ড। অথচ এই স্বল্প সময়ের ফুটেজ ঘিরেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিতর্ক।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের একটি ১৯ সেকেন্ডের ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি ক্যামেরার সামনে এক হাজার ও পাঁচশো টাকার নোট উঁচিয়ে ধরছেন। অভিযোগ ওঠে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ভোটারদের টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় ক্ষুব্ধ জনতা তাদের ঘিরে ধরে প্রতিবাদ জানায়। মুহূর্তেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে, শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার ঝড়। ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওটির পেছনের প্রকৃত ঘটনা জানতে অনুসন্ধানে নামে বাংলা এডিশন। অনুসন্ধান পরিচালনা করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক আতিফ রাসেল।
মূলত নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকালে উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের জগতকুড়া গ্রামে গণসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। এসময় একই গ্রামের ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খাঁসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে জামায়াতে ইসলামীর গণসংযোগে বাধা দেয় এবং এক পর্যায়ে হামলা চালায়।
এঘটনায় জামায়াতের রবিউল আলম তালুকদার ও মনিরুজ্জামানসহ অন্তত চারজন আহত হন। আহতদের অভিযোগ, আমরা নির্বাচনী প্রচারণায় গেলে নিয়ামত আলী খাঁসহ ২০ থেকে ৩০ জন আমাদের বাধা দেয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তারা আমাদের ওপর হামলা চালায়। একজন নেতা গলায় মাফলার পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে, অর্জুনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খাঁ দাবি করেন, জামায়াতের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ে ভোট চাইতে গিয়ে টাকা লেনদেন করছিল এমন অভিযোগে স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানায়।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আমার বাড়ী কাছে থাকায় অতিরিক্ত লোকজনের শব্দ শুনে আমি আসি। পরে সব নিয়ন্ত্রণ করি। আমরা তাদের ওপর কোনো হামলা করিনি। তবে তিনি নিজ চোখে টাকা বিতরণ করতে দেখেননি বলেও জানান বাংলা এডিশনকে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী জমায়েত নেতা মো. রবিউল আলম তালুকদার বাদী হয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারনায় বাধা ও হামলা করে হয়। অভিযোগে আরো বলা হয়, ভবিষ্যতে জামায়াত শিবির করলে তাদের মেরে ফেলার হুমকি দেয় এবং ১২ তারিখেরে পর গ্রামের যারা জামায়াতকে ভোট দিবে এবং সহযোগিতা করবে তাদেরকে গ্রাম ছাড়া এবং বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হুমকি দেয়।
এরপর ঘটনার দিন (২৮ জানুয়ারি) বিকেল ৩টায় হামলা ও অপপ্রচারের অভিযোগ এনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মওলানা হুমায়ুন কবির ভূঞাপুর উপজেলা প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সময় তার দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বাদ যায়নি নারী কর্মীরাও। প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরার অনুরোধ জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলন শেষে হামলার প্রতিবাদে ভূঞাপুর কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে তারা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে সংক্ষেপ সমাবেশে বিএনপি বিরুদ্ধে জামায়েতের নিবাচনী প্রাচারণায় বাধা, হামলাসহ অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ এনে প্রাসাশনের কাছে সঠিক বিচার চান উপজেলা জামায়াতের আমির আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন জামায়েতের এমপি প্রার্থী মওলানা হুমায়ুন কবির ও উপজেলা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন পদের দায়িত্বশীলরা।
বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানের পর্যালোচনায় ভাইরাল হওয়া সেই ১৯ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে লাল দাড়িযুক্ত পাঞ্জাবি পড়ে মুঠফোনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাওয়া ব্যাক্তিটি জামায়াতের ইউনিয়ন সভাপতি কাজী নুরুল ইসলাম। ভিডিওটির ঠিক ১৪ সেকেন্ডর মাথায় দেখা যায়, হলুদ গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা এক যুবক পাঁচশো টাকার নোট পাশের এক ব্যক্তির হাতে গুঁজে দিচ্ছেন। পরে সেই ব্যক্তিকেও ক্যামেরার সামনে টাকা উঁচু করতেও দেখা গেছে। মূলত গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা সেই যুবকের নাম শামীম। শামীম হলেন অজুনা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি। ভিডিওটিতে আরও দেখা যাচ্ছে ক্যাপ পরা লাল দাড়িওয়ালা ব্যক্তি। যার নাম লাবু খাঁ। সে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক।
ভিডিওতে টাকা বিলি করা ছাত্রদল নেতা শামীম নামের ওই যুবকের কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি বাংলা এডিশনকে মুঠোফোনে জানান, টাকার বিনিময়ে অনুমিতি নিয়ে বাড়ীর উঠানে গণসংযোগের বৈঠক হয় এবং ওই বাড়ীর লোকজনকে সেই টাকা দেয়ার সময় আমরা উপস্থিত হলে টাকা ফেলে চলে যায় জামায়েত নেতাকর্মীরা, আর সেই টাকাগুলোই আমরা দেখিয়েছি ক্যামেরার সামনে।
অন্যদিকে, ছাত্রদল নেতা শামিমের এই বক্তব্য সরাসরি অস্বিকার করেছেন বাড়িটির লোকজন। টাকা নেয়ার কথা যদি কেউ বলতে পারে তাকে জুতা দিয়ে পিটানোর কথাও বলেন তারা।
বাংলা এডিশনের হাতে আসা আরেকটি ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, ঐদিন বাড়িটির উঠানে জামায়াতের গণসংযোগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। বিএনপির স্থানীয় নেতারা গণসংযোগে জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাধা দেয়ার পাশাপাশি বিএনপির কর্মীরা চেয়ার দিয়াও আঘাত করে বলে ভিডিওতে শোনা যায়।
জামায়াত নেতাদের দাবি, হামলার পরই উদ্দেশ্যমূলকভাবে “টাকা দিয়ে ভোট কেনা হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে ওই ১৯ সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।
ঘটনার আরও বিস্তারিত জানতে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে যান বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী সাংবাদিক আতিফ রাসেল। অনুসন্ধানী এই সাংবাদিককে স্থানীয়রা জানান, জামায়েত নেতাদের কোনো টাকা বিতরণ করতে দেখেনি তারা। আর যাদের হাতে টাকা তাদের চিনেন না বলে জানায় স্থানীয়রা।
অর্জুনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির স্ত্রীর দাবি, তার স্বামীকে কেউ ফোন দিয়ে জামায়েতের গণসংযোগের কথা জানিয়েছে তারপর কর্মীদের সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায় তার স্বামী।
ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান করতে করতে বাংলা এডিশনের হাতে আসে এক ভয়াবহ তথ্য। ঐদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা নাম পরিচয় গোপণ রাখার শর্তে এক বিএনপি নেতা জানায়, জামায়াত নেতাদের ফাঁসাতেই পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছিলো এই ঘটনা।
এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু না বললেও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বাংলা এডিশন কে মুঠোফোনে জানান, আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদ বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। আওয়ামী লীগের কিছু চিহ্নিত লোকজন জামায়াতের সাথে যুক্ত হয়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করছে। ফ্যাসিবাদরা বিগত দিনে টাকা-পয়সা দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করেছে। সেই কায়দার তারা এখনও জামায়াতের সাথে যুক্ত হয়ে নির্বাচনী প্রচারনা চালাচ্ছে।
ভূঞাপুর থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ সাব্বির রহমান বলেন- জামায়াতে ইসলামী যে টাকা দিয়েছে আমরা সরজমিনে গিয়ে তার কোন সত্যতা পাইনি।
এবিষয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি ম্যাজিস্ট্রেট ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রাজিব হোসেন বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজন সাথে কথা বলেছি। সেখানে গিয়ে ভোটারদের সাথে কথা বলে টাকা লেনদেনের কোন প্রমাণ পাইনি। তবে দুই পক্ষের ধস্তাধস্তির হয়েছে সেই বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি।
অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের পরও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও আনন্দঘন পরিবেশে নির্বাচন হবে, ভোটাররা আনন্দে ভোট কেন্দ্রে যাবেন কাঙ্খিত ভোট প্রাদান করতে এমনটাই আশা স্থানীয়দের।
আতিফ রাসেল, সাংবাদিক (বাংলা এডিশন) টাঙ্গাইল
আরও পড়ুন:








