বিগত ফ্যাসিবাদ আমল থেকে আজ অব্দি গণ-বিচার (মবজাস্টিস) এবং গণ-সহিংসতা গভীর উদ্বেগজনক সামাজিক ঘটনা। মবজাস্টিস বিশ্বের অনেক দেশেই ঘটছে, তবে ভারত ও বাংলাদেশে এর মাত্রা আশংকাজনক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা এক ধরনের সম্মিলিত আগ্রাসন। সমাজের একদল লোক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রশাসনের সামনে প্রায়শই মানুষের শারীরিক, মানসিক আঘাত এবং সম্পত্তির ধ্বংস, এমনকি জীবনহানি ঘটছে। মবজাস্টিস দ্রুতই গণসহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। মবজাস্টিসে জনতা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অন্যায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়। অন্যদিকে, গণ-সহিংসতা বলতে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত যেকোন সহিংসতাকে বোঝায়- তা অপরাধ, সন্দেহ বা শাস্তির সাথে সম্পর্কিত হোক বা না হোক। উভয় ঘটনাই সমাজের গভীর সমস্যার নেতিবাচক প্রতিফলন। এমনটি ঘটার অন্যতম কারণ হলো, আইন-আদালত, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আস্থার অভাব। মবজাস্টিস-এর বাম্ফার ফলনের সাথে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদকে লালন-পালন, তোষণ-পোষণ এবং গণহত্যার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংযোগ সমানুপাতিক। মবজাস্টিস-এর এই বাম্পার ফলনের কারণ ফ্যাসিস্ট আমলের সব ধরনের নির্মম অন্যায়সূচক বিষয়াদির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতি সুস্পষ্ট হতাশা, গণ-মনস্তত্ত্ব, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক কারসাজি এবং গুজবের বিপজ্জনক বিস্তার। তবে অনেকেই মবজাস্টিস (গণ-বিচার), গণ-সহিংসতা ও গণপ্রতিরোধকে এক করে ফেলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গণ-বিচার তখন ঘটে যখন একদল ব্যক্তি প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে তোয়াক্কা না করে নিজেরাই বিচারক, জুরি এবং জল্লাদ হিশেবে কাজ করে। সাধারণত চুরি, খুন, প্রেম ও পরকীয়া বা অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ, ধর্ষণ বা অন্যান্য অপরাধের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে মব জাস্টিস সংঘটিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অজ্ঞ-অবিবেচক জনতার এই ধরনের বিচার মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ তদন্ত, প্রমাণ বা উপযুক্ত স্বাক্ষী প্রমাণ ছাড়াই লঘু পাপে গুরুদন্ড বা অনায্য কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে না এবং অনেক ক্ষেত্রে, সন্দেহ, গুজব, ভুল বোঝাবুঝি বা মিথ্যা অভিযোগের উপর ভিত্তি করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নাটক সাজিয়েও মবজাস্টিস করা হয়। যদিও এই ধরনের অবিচার সমাজের কিছু কিছু বালখিল্য মানুষের কাছে তাৎক্ষণিক ‘উচিৎ শিক্ষা’ এবং কার্যকর জবাবদিহিতার একটি বিশেষ ফজিলতপূর্ণ কাজ হিশেবে বিবেচিত; তবুও বাস্তবতা হলো, জনতার বিচার শেষ পর্যন্ত আইনি প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং সমাজ-রাষ্ট্রকে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির দিকে পরিচালিত করে। তখন তা ধীরে ধীরে জনসহিংসা ও জনসহিংসতায় রূপ নেয়।
গণসহিংসতা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত এবং বিশেষ শ্রেণীর মানুষের সংঘবদ্ধ আগ্রাসন, যা ফ্যাসিস্ট ও ফ্যাসিস্টের পৃষ্টপোষক নির্মূলকরণ, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ভিন্নমত দমন, জাতিগত সংঘাত, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক অবিচার, অসাম্য-বৈষম্য, দুরাচার-দুর্বিচার, দুঃশাসন, সামাজিক হতাশা অথবা স্বতঃস্ফূর্ত মানসিক বিস্ফোরণ থেকে উদ্ভূত হতে পারে। তবে মবজাস্টিসের সাথে গণসহিংসতার সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বিস্তৃতভাবে পার্থক্য রয়েছে মবজাস্টিস, গণসহিংসতা ও গণপ্রতিরোধের মাঝেও। কোন প্রতিরোধ বা গণপ্রতিরোধ হলেই সেটিকে মবজাস্টিস বলে প্রচারণা চালানো একশ্রেণীর মব-সুশীলের নেশায় পরিণত হয়েছে, যা হতাশাব্যঞ্জক ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য রীতিমত ভীতিজনক ও ভয়ংকর ক্ষতিকর। মবজাস্টিসের কারণে যদি একজন কথিত অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয় অথবা শাস্তির ভয় দেখিয়ে যদি ব্লাক মেইল করা হয় সেটি কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবং জনতার সম্মিলিত ক্রোধ প্রদর্শন, প্রতিশোধ গ্রহণ, সম্পত্তি ধ্বংস, কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্থ করে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক লাভালাভের বিষয় সম্পৃক্ত হয়ে পড়া সভ্য সমাজে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ আমলে এলাকায় এলাকায় খুন-খারাবি, হত্যা-লুণ্ঠন, রাহাজানি, নির্যাতন-নিপীড়ন ও ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যারা ব্যাপক পরিসরে কাজ করেছে, এবং তারা যারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে যদি থেকে থাকে তাহলে জনগণ তাদের ধরে আইনের হাতে দিলে সেটিকে যারা মবার ও মবজাস্টিস বলে আখ্যায়িত করছে এরা কেউ জুলাই অভ্যুত্থানে রক্ত দেওয়া দূরে থাক এরা কোন আন্দোলন সংগ্রামেই ছিলেন না। ১৫ শত শহীদের আত্মার অভিশাপ, প্রায় ৫০ হাজার মারাত্মক আহতের আর্তচিৎকারের সাথে এদের কোন সংস্রব নেই। এদের কোন নিকট আত্মীয় দূরে থাক এদের দূর-আত্মীয়ও কেউ এই আন্দোলনের স্টেক নয়। যে-কারণে ‘র’ এর আদলে প্রপাগান্ডার বিস্তার করছে এবং সবকিছুকে মবজাস্টিসের সাথে গুলিয়ে দিচ্ছে। এই ধরনের মব-সুশীলরাই দেশকে আবারও নব্য-ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমকেও তারা ফ্যাসিবাদের পুনঃআতুঁড় ঘর বানাচ্ছেন। গণবিচার-গণসহিংসতা নিয়ে এরা গণমাধ্যমে এমনভাবে ন্যারেটিব দাঁড় করায় যেন তারা বিদেশি। বাংলাদেশে যে ২৪ সালে এক বিশাল অভ্যুত্থান হয়েছে এরা তা যেন জানেন-ই না। আফসোস! গণধিক্কৃত কিছু মব-সুশীল গণমাধ্যমে আবারও চেগিয়ে উঠছে। কেউ কেউ গণ-বিচার, গণসহিংসতা ও গণপ্রতিরোধ সমশব্দ (synonymous) মনে করছেন। এবং এইসব পরিকল্পিত মিথ্যার অব্যাহত প্রচার করছেন। তবে তা অজ্ঞাতসারে নয়; বরং মব-সুশীলরা জেনে বুঝেই সেটি করছেন, যা দেশের স্বাধীনতার জন্য ভয়ানক আলামত। মনে রাখতে হবে বৃহৎ আকারের দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ এবং সহিংস প্রতিবাদ আন্দোলন হলো জনতার সহিংসতার সাধারণ উদাহরণ। আর এসবের উপর ভিত্তি করে টাউটারি ও ধান্দাবাজি-চান্দাবাজি করা গণবিচারের অন্যতম লক্ষ্য। এটিকে শক্তহাতে দমন করতে হবে। কিন্তু সাথে সাথে মনে রাখতে হবে, গণপ্রতিরোধ থেমে গেলেই ফ্যাসিবাদ চট করে মাথা তুলে দাঁড়াবে যা বাংলাদেশের মানুষের জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়। মব-সুশীলেরা সুচিন্তিত ভাবে স্লো-পয়জনিং-এর মতো করে ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন চাচ্ছেন। তাদের জন্যই গণপ্রতিরোধ প্রয়োজন। আরও একবার জনতার জেগে ওঠা দরকার।
প্রসংগক্রমে বলা যায়, জনতার সহিংসতা এবং জনতার বিচার নতুন বিষয় নয়। মানব ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে মানব-সমাজ যৌথ আক্রমণ, লিঞ্চিং, তথাকথিত ডাইনি শিকার এবং সহিংস দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছে। আধুনিক আইনি ব্যবস্থা প্রবর্তনের পূর্বে, প্রায়শই জনসাধারণ শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতো, যা আজকের জনতার বিচারের অনুরূপ। মধ্যযুগে ইউরোপে অদ্ভূত ব্যবস্থা ছিলো। সেখানে, জাদুবিদ্যার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিচার ছাড়াই প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। আমেরিকাতে, লিঞ্চিং ছিলো বর্ণবাদী জনতার সহিংসতার একটি নিকৃষ্ট বিস্তৃত রূপ, যেখানে আফ্রিকান আমেরিকানদের বানোয়াট বা অতিরঞ্জিত অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা করা হতো। আফ্রিকা এবং এশিয়া জুড়ে ঔপনিবেশিক এবং ঔপনিবেশিক-উত্তর সমাজে, দুর্বল বা নিপীড়নমূলক পুলিশিংয়ের প্রতিক্রিয়ায় জনতার বিচার নিয়মিতভাবে সংগঠিত হতো। ভারতে এখনো প্রকাশ্যে মুসলিম হত্যা-ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ অবিচার-অনাচার এখনো ভয়াবহভাবে চলমান। তবে মব-সুশীলরা এসব বিষয়ে নিশ্চুপ। কারণ ‘নুন খাই যার গুণ গাই তার’ চরিত্রে নিখুঁত অভিনয় করছেন এই সব দেশদ্রোহী মব-সুশীল ও কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।
এখনো জনতার বিচার (মব-জাস্টিস) এবং জনসহিংসতা বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিবর্তে গভীর সামাজিক সমস্যার লক্ষণ হিশেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যখন প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা কমে, দারিদ্র্য এবং বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং আবেগ যখন যুক্তিসঙ্গত বিচারকে অগ্রাহ্য করে, মানুষ ন্যায্য ও সহজলভ্য ন্যায়বিচারে আশা হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজে এই সব অবিচার দেখা যায়। তবে উগ্র-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভারতের মতো হলে শুধু মুসলিম নিধনের জন্য-ও মবজাস্টিস হতে পারে। যার কারণ-ই হচ্ছে এথনিক ক্লিনিজিং। যদিও অনেকে বলতে পারেন যে, মবজাস্টিসকারীরা ন্যায়বিচারের নামে কাজ করছেন। তারা সঠিক বলছেন না। বাস্তবতা হলো গণবিচার ও গণসহিংসতা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারকেই ধ্বংস করে। নিরীহ-নিরাপদ মানুষ মারা যায়। আইনি কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায়। সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং ভয় ও নিপীড়ন-চক্র শান্তির বৃত্ত দখল করে। তবে গণপ্রতিরোধ সমাজে থাকতেই হবে। তা না হলে অসামাজিক কার্যকলাপ এবং বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাবে, যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক
আরও পড়ুন:








