১৩ ই নভেম্বর ছিল মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক হাসিনার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের দিন। সেই উপলক্ষে সারাদেশব্যাপী আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন নাশকতার ছক এঁকেছিল। তার প্রেক্ষিতে সারাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ বিভিন্ন বাড়িতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অফিসে শিল্প-কল কারখানায় পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। কোথাও কোথাও মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশের মানুষের মাঝে। কিন্তু ঢাকা লকডাউন পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী একটি দল বস্তুত দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল তাদের আহুত লকডাউন কর্মসূচি এতটা ফ্লপ করবে তা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। কারণ আওয়ামী লীগ মানেই খুনি, বিধ্বংসী। এবং নমরুদ ফেরাউনের মতো নৃশংসতার প্রতীক। সুতরাং তাদের যেকোন ধরনের আন্দোলনের ডাক মানুষ জীবন-মরণ হিশেবে গ্রহণ করে। তাহলে এবার কেন টাকা পয়সা দিয়ে ছিন্নমূল মানুষ, বস্তির ছেলে ও টোকাইদের দিয়ে কিছু বিচ্ছিন্ন আক্রমণ ছাড়া আর কোন কিছু সফলতা এলো না।
কেন এমন হলো? তা একটি বড় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোই স্বাধীনতা পূর্বসময়ে ভোটে নির্বাচিত হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কোনবারই নিরপেক্ষ-সুষ্ঠু- স্বচ্ছ নির্বাচনে জয় লাভ করেনি। তারা যে ক'টি নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এসেছে সেগুলো ছিল সর্বৈব পাতানো নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হলেও বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রদেয় ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'এর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতায়, প্রশাসনযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্বেই নির্ধারিত ফলাফল ঘোষণা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়। যে কারণে বাস্তবিক পক্ষে সাধারণ মানুষের ভিতরে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কখনো ছিল না। এখনও নেই। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ভোট হলে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে আওয়ামী লীগ কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারেনি। পারবেও না। যে কারণে তাদের ঘোষিত কর্মসূচি শুধু ইথারে ইথারে ভেসে বেড়ায়। বাংলার জমিনে সেটি সফলতার মুখ দেখে না। আওয়ামী লীগের আন্দোলন মানেই কিছু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও কার্যকলাপ, ভ্রাম্যমাণ নাশকতা, নিরপরাধ নিরীহ দোকানপাট ব্যবসা ক্ষেত্রে আক্রমণ। এছাড়া তাদের দিয়ে সুসংঘটিত আন্দোলন হওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। অনেকের ধারণা বাংলাদেশে মনে হয় শতকরা ৫০ ভাগ মানুষই আওয়ামী লীগের কঠোর সমার্থক। বিষয়টি আদৌ তা নয়। বাংলাদেশের হিন্দু ভোট বাদ দিলে মুসলিমদের মধ্যে আওয়ামী লীগকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ কঠোরভাবে সমর্থন করে। এবং এ কথা সত্য যে, এই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে একটি কাল্ট বা ধর্ম হিশেবে মানে। যে ধর্মের অবতার শেখ মুজিবুর রহমান। তাদের প্রভু দিল্লির মসনদের প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ তাদের প্রভু থাকেন দিল্লিতে। এই আওয়ামী মৌলবাদী সমর্থকগণ যেকোন পরিস্থিতিতে রাজপথে নামতে পারে। প্রাণ দিতে পারে। কারণ তারা আওয়ামী ধর্মে দীক্ষিত। তারা মুসলিম নয়। এর বাইরে তাদের সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সমর্থক নেই। যারা যেকোন মুহূর্তে রাজপথ কাঁপিয়ে দিতে পারে। অবরোধ করতে পারে। যেকোন সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে নামিয়ে আনতে পারে এমন সমর্থক নেই। কারণ ১৩ নভেম্বর তারা ঢাকাকেন্দ্রিক যে লকডাউন দেয় সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিল অপ্রতুল। প্রস্তুতি ছিল না বললেই চলে। সেনা সদস্যদের তেমন দেখা যায় নি। পত্র-পত্রিকা মারফত জেনেছিলাম বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু ১৩ই নভেম্বর ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া গমনকালে কোথাও বিজিবি বা সেনা সদস্যের দেখা পাওয়া গেল না। এটি হতাশাব্যঞ্জক ও রীতিমতো আতঙ্কের।
সত্যিকার অর্থে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তেমন উপস্থিতি না থাকলেও জনগণ আওয়ামীলীগের পক্ষ হয়ে রাজপথে নামেনি। জামায়াত ইসলামের অঙ্গ সংগঠন লকডাউনের বিরুদ্ধে কিছু মিছিল মিটিং করেছে। বিএনপি উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি। এরপরও আওয়ামী লীগের সমর্থনে কোন মিছিল মিটিং হলো না কেন? কারণ সাধারণ জনগণের মাঝে এদের গ্রহণযোগ্যতা নাই।
চলতি পথে ফরিদপুর নেমে একটি ডাবের দোকান থেকে ডাব কিনলাম। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আজকে আন্দোলন কেমন হলো? তিনি বললেন তেমন কিছু না।
আমি ইচ্ছা করে বললাম, কেনো শেখ হাসিনা তো অনেক উন্নয়ন করেছে। এতো সহজে মানুষ ভুলে গেল? তিনি জবাবে বললেন, উন্নয়ন দিয়ে কি হবে? সে তো গুলি করে মানুষ মা'রে ফেলেছে। এতে বোঝা গেল হাসিনার এই মানুষ হত্যাকে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। কোনভাবেই আওয়ামী লীগ বা হাসিনা ফিরে আসুক রাজনীতিতে, তা দেশের মানুষ চায় না। আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে কি পারবে না একটি গণভোট হলেই এ কথার যথার্থতা পাওয়া যাবে। অথবা ভবিষ্যতে যে গণভোট হতে যাচ্ছে সেখানে যদি এ ধরনের প্রশ্ন রাখা হয়, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করা কি উচিত? আমরা আশা করি সেখানে 'না' এর পক্ষেই প্রায় আশি শতাংশ ভোট পড়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী? আওয়ামীলীগের এই ভরাডুবির জন্য আওয়ামী লীগ ও তাদের নেত্রী হাসিনা দায়ী।
বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে পছন্দ অপছন্দ করে কিনা জানিনা তবে ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়। ভারতের প্রভুত্ব বাংলাদেশের মানুষ সহ্য করতে চায় না। দাদাগিরি ফলানোর কারণেই ভারত-বাংলাদেশের মানুষের চোখে এখন মহাশত্রু। আর সেই মহাশত্রুকে মহাপ্রভু মনে করে হাসিনা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। অতএব লেন্দুপ দর্জির ছোট বোন যে হাসিনা এ বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষ নিঃসন্দেহ। যে-কারণে হাসিনাকে আর এদেশের মানুষ ক্ষমতা তো দূরে থাক রাজনীতিতেই দেখতে চায় না। হাসিনার ইহকাল বলতে টুঙ্গিপাড়া। আর সে মনে করে, পরকাল বলতে দিল্লিদা। অতএব সে তার ইহকাল পরকাল ও ১৫ টি ব্রিফকেস ভর্তি বাংলাদেশের মানুষের রক্ত বিক্রি করা ডলার নিয়ে পালিয়েছে। এটাই তার সম্বল। এসব নিয়েই সে সুখে শান্তিতে আছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে সামান্য কিছু ডলার ভাঙ্গিয়ে পাঁচ দশ হাজার করে টাকা দিয়ে নিরীহ মানুষকে বলে, পেট্রোল বোমা মেরে আসো।
কেউ কেউ বোমা মারছেও। এই ঝুঁকি, কেন নিচ্ছে তারা? শুধু টাকার জন্য না। সাথে সাথে দেশ জনতার ব্যর্থতাও আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নজরদারিতে রাখতে পারছে না।
যদি এমন হয় তাহলে ১৭ নভেম্বর তারিখে যে রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে তার আগে এবং পরে আওয়ামী লীগ বড় অঘটন ঘটিয়ে ছাড়তে পারে।
তাই মহাপ্রস্তুতি গ্রহণের সময় এখনই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি যথোপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে কঠোর হাতে দমন না করে তাহলে জনসাধারণের জীবনে অস্বস্তি, আতঙ্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সরকারের প্রতি এমনি মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে আগেই। এখন যদি নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত না করতে পারে তাহলে মানুষ মনে করবে ইলেকশন আরো আগেই হোক। এবং এরা বিদায় হোক।
*কী হতে পারে হাসিনার রায়*
সামান্য সচেতন মানুষও নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারে যে, ফাঁসির রায় ছাড়া হাসিনার ললাটে আর কোন বিকল্প নেই। যে পরিমাণ গুম-খুন, হত্যা-রাহাজানি, লাশ পুড়ানো, শাপলা চত্বর গণহত্যা, শাহবাগীদের দিয়ে আলেম ওলামা হত্যা, পুলিশকে গুলি করে হত্যা করে আন্দোলনকারীদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া, এত এত অপরাধের অকাট্য দলিল থাকায় সহজেই বলা যায়, একবার নয় হাসিনার ১০০ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। আদালতের রায়ে হয়তো একবার ফাঁসির আদেশ থাকবে। তাই অসীম অপরাধ বিবেচনায় অর্থাৎ গুরু পাপে লঘুদন্ড তথা এই সামান্য শাস্তি আওয়ামীলীগের মেনে নেয়া উচিত। কারণ তথ্য ও যোগাযোগের যুগে কোন সত্যই লুকানো যায় না। হাসিনার কল রেকর্ডসহ, রাজসাক্ষীর জবানবন্দী ও জাতিসংঘের রিপোর্ট সবমিলিয়ে হাসিনা যে পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত খুনি তার প্রমাণ সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু নিকৃষ্ট আওয়ামী লীগ একবারও আত্মসমালোচনা করে না। তারা মনে করে আওয়ামীলীগ যারা করে না তাদের হত্যা করা কোন ব্যাপারই না। এটার জন্য আবার কিসের বিচার হবে? এমন এক ধরনের পৈশাচিকতা ও দাম্ভিকতা আওয়ামী লীগের মধ্যে সুস্থিত। তারা মনে করেছিল কখনোই ক্ষমতা থেকে যাবে না। অতএব ছাত্র জনতাকে হত্যা করলে তাদের কোন দায়ভারও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, প্রতিটি অনুপরমাণুই হিসাবের মধ্যেই থাকে। ভুলে গেলে চলবে না, আজ যাকে হত্যা করছো, কালকে তার সন্তানেরা তোমাকে হত্যা করবে। আওয়ামীলীগ সাবধান হয়ে কাজ করো। না হলে যেটুকু রুট ছিল সেটুকুও বাংলাদেশের মানুষ উড়ে ফেলবে। আওয়ামী লীগের জন্য চরম শিক্ষা কাজী নজরুলের কবিতায় লক্ষ্য করা যায়-
"কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,
আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।
আজি সম্রাট্ কালি সে বন্দী,
কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দী!
কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,
তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ যারে করে পদাহত!"
তবে আওয়ামী লীগকে সহজ হিশেবে গ্রহণ করা সরকারের জন্য ব্যর্থতার পরিচয় হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদা তৎপরতা এবং কঠোরতা নাগরিকের সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য এখনো অতিব জরুরী। ইউনুস সরকারের তরফ থেকে জনগণের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। জনগণের উচিত যার যার অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগকে ও তাদের ঘোষিত অগণতান্ত্রিক ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপকে প্রতিহত করা। তা না হলে, এই বিন্দু বিন্দু আন্দোলন একসময় সিন্ধুর রূপ নিতে পারে। তখন তারা তাদের প্রভু দেশের আরএসএসের বাংলাদেশের সহযোগী ইসকন সন্ত্রাসীদের নিয়ে বাংলাদেশকে রক্তের সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে।
বিএনপি ও জামায়াত ছাড় দেবেন না। মনে রাখবেন আওয়ামীলীগ যদি এই মাটিতে কখনো ক্ষমতায় ফিরতে পারে, তাহলে এবার জিয়াউর রহমানের কবর ঢাকায় রাখবে না। ম্যাডামেরও হাড় তুলে বিচার করার চেষ্টা করবে। জামায়াতের তো কারোরই অস্তিত্ব রাখবে না। কোন হিন্দু লোকের মুখে দাড়ি থাকলেও তাদেরকে হত্যা করবে আওয়ামী লীগ। অতএব অতীব সাবধানতার সাথে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করে দেওয়ার মধ্যেই দেশপ্রেম সর্বৈবভাবে নিহিত।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক।
আরও পড়ুন:








