বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী। সনাতনী ধর্মালম্বীদের কাছে এটি আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতার নাম। কিন্তু, সম্প্রতি এখানেই ঘটে যাওয়া একটি বিয়েকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের ঢেউ।
অভিযোগ উঠেছে, শুক্রবার (১০ জুলাই) সনাতনী ধর্মালম্বীদের এই প্রাণকেন্দ্র ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এক ট্রান্সজেন্ডারের বিয়ের মাধ্যমে ওপেন সমকামীতার সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিয়ের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জনমনে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া। কিন্তু প্রশ্নের ধোঁয়াশা যেন এখানেই, এটি কি কেবল নিছক একটি বিয়ে ছিল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অদৃশ্য বাস্তবতা?
সরেজমিনে অনুসন্ধান
সেই ধোঁয়াশার উত্তর জানতেই অনুসন্ধানে সরেজমিনে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে উপস্থিত হয় টিম বাংলা এডিশন। মন্দিরে গিয়ে, আগত একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও, তারা বিষয়টি বিভিন্নভাবে এড়িয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টিকারী এই বিষয় সম্পর্কেও তারা কিছু জানে না বলে দাবি করে।
অভিযোগ উঠেছে, মন্দিরের কোনো কোনো পুরোহিত মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে, এ ধরনের বিয়ে পড়িয়ে থাকেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মন্দির কার্যালয়ে যায় টিম বাংলা এডিশন। কিন্তু সেখানেও কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বললে তাদের বক্তব্যে ধোঁয়াশার কালো মেঘ আরও ঘন হয়ে ওঠে। তারা, এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করে, বরং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিতে থাকে। বিষয়টি ঘিরে সৃষ্টি হয় আরো ধোঁয়াশা।
মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি
কয়েক দফা চেষ্টার পর অবশেষে মুঠোফোনে যোগাযোগ সম্ভব হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা পাত্র-পাত্রীর দেয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতেই বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। পাত্রী যে মুসলিম এবং ট্রান্সজেন্ডার, এ বিষয়ে পুরোহিতের কোনো ধারণাই ছিল না; বরং সরল বিশ্বাসে তিনি এই কাজটি করেছেন বলে জানান। পাশাপাশি তারা দাবি করে, বিষয়টি জানার পর চকবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশের ভিন্ন বক্তব্য
তবে, বিপত্তি ঘটে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন মামুনের সঙ্গে কথা বলার পর। তার দাবি, থানায় মন্দির কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগই দায়ের করা হয়নি। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে ঘটনাটি তাদের কাছে পৌঁছেছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের নিজেদের দায়মুক্তির জন্য ট্রান্সজেন্ডারের বিয়েটিকে ‘সরল বিশ্বাস’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে থানায় অভিযোগ করার দাবির সঙ্গে পুলিশের বক্তব্যের অসামঞ্জস্যতা, পুরো বিষয়টিকে আরও সন্দিহান করে তোলে।
সাক্ষীর বক্তব্য
এই অন্ধকার দূর করতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় বিয়ের সাক্ষীদের সঙ্গে। তবে কথিত ছয়জন সাক্ষীর মধ্যে চারজনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, একজন ব্যস্ততার অজুহাতে, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। অপর সাক্ষী স্বপ্না বিশ্বাসের সঙ্গে দীর্ঘ চেষ্টার পর কথা বলা সম্ভব হয়। তার বক্তব্যে উঠে আসে এমন কিছু তথ্য, যা সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে মন্দিরের ব্যবস্থাপনাকে। তিনি জানান, তিনি বর-কনের কোনো আত্মীয় নন; বরং মন্দিরের ভেতরে একজন তাকে সাক্ষী দেয়ার জন্য অনুরোধ করায় তিনি সাক্ষী হয়েছেন।
বাংলা এডিশনকে দেয়া সাক্ষীর এই বক্তব্য, মন্দির কর্তৃপক্ষের ‘সরল বিশ্বাসে’ বিয়ে করানোর দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কারণ, মন্দির কর্তৃপক্ষ বলছে, সাক্ষীদের বর-কনের পক্ষ থেকেই নিয়ে আসা হয়েছিল, অথচ সাক্ষীর দাবি, তিনি তাদের কোনো আত্মীয় নন। এই দ্বন্দ্ব নতুন করে প্রশ্ন তোলে, যাচাই-বাছাই ছাড়া সাক্ষী গ্রহণ কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয়?
ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্য
অন্যদিকে, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে মন্দিরে দেয়া এনআইডিটি ভুয়া। ওই এনআইডি নম্বর প্রকৃতপক্ষে মো. জাহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির। তার পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে নাম, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা ও ছবি পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়াও, তথ্য বলছে, ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে পরিচিত তাসনুভা আনান একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং তিনি নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার নারী মডেল ও নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচয় দিয়ে থাকতেন। তার বিভিন্ন নথি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
একদিকে মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, তথ্য গোপন করে সরল বিশ্বাসে বিয়ে পড়ানো হয়েছে এবং বিষয়টি জানার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য, তাদের কাছে কোনো অভিযোগই পৌঁছেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাক্ষী নিয়ে অসামঞ্জস্যতা এবং ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্য।
এসব বিষয় একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতি, যেখানে মন্দির কর্তৃপক্ষের ভূমিকাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জায়গা। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটির এই অসামঞ্জস্যতাগুলো ইঙ্গিত করছে সম্ভাব্য প্রক্রিয়াগত ত্রুটি কিংবা দায়িত্বে ঘাটতির দিকে।
বিশ্লেষকদের মতে এই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি এখন বৃহত্তর সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। তাই প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, যেখানে আবেগ নয়, প্রাধান্য পাবে প্রমাণ; অভিযোগ নয়, প্রতিষ্ঠিত হবে সত্য।
আরও পড়ুন:








