রবিবার

১২ জুলাই, ২০২৬ ২৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

অভিনেত্রীদের হানি ট্র্যাপ ও ধর্ম ব্যবসা, টার্গেট বিত্তবানরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ২২:৪২

আপডেট: ১২ জুলাই, ২০২৬ ২২:৫৬

শেয়ার

অভিনেত্রীদের হানি ট্র্যাপ ও ধর্ম ব্যবসা, টার্গেট বিত্তবানরা
ছবি সংগৃহীত

হানি ট্র্যাপে ভরে গেছে দেশ। টার্গেট বিত্তবানরা। রূপালি পর্দার অভিনেত্রীদের নতুন প্রতারণা ‘ধর্ম ব্যবসা’ অভিনেত্রীদের মুখোশ। একাধিক অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ; ক্ষোভ প্রকাশ নেটিজেনদের।

বাংলা সিনেমা হোক বা ছোট পর্দার ছোট্ট কোনো নাটক, ব্লকবাস্টার বা সুপারহিট, যেন আজ তা এক বিরূপ বাস্তবতার ছবি। উলঙ্গপনা প্রদর্শন, বেহায়াপনার সয়লাব ও অর্ধনগ্ন নৃত্যের চমক, এসবই যেন হয়ে উঠেছে সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। দেশজুড়ে এসব নিয়ে সমালোচনার ঢেউ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, এই মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির এক অদৃশ্য ‘নগ্ন দাবা খেলায়’ দীর্ঘদিন ধরে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে সিনেমা ও নাটক জগতের অনেক অভিনেত্রী ও মডেল। আর এসব অভিনেত্রীদের অশ্লীলতা, অশালীনতা ও লজ্জাহীনতার মাত্রা যেন বরাবরই বিপদসীমার ওপরে চলে যাচ্ছে। তাদের এসব কার্যকলাপকে রুচির দুর্ভিক্ষ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে, এসব অভিনেত্রীদের সেই রূপালি পর্দার আড়ালেও রয়েছে ভিন্ন এক জগৎ। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই জগৎ হচ্ছে অভিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখা এক ‘ধর্ম ব্যবসা’। অনেকেই বলছে, রূপালি পর্দার এসব অভিনেত্রী ও মডেল মানুষের সহানুভূতি, আবেগ ও সমর্থন অর্জনের জন্য শরীরে ধর্মের চাদর জড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশে যেসব মডেলকে নিয়ে দিনের পর দিন বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম মেঘনা আলমের নাম। জানা যায়, মেঘনা আলম ২০২০ সালে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার আসর ‘মিস আর্থ বাংলাদেশ’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়ে রূপালি পর্দার জগতে উঠে আসেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই মিস আর্থ-এর ন্যাশনাল ডিরেক্টর হন।

তবে, গেল বছরের এপ্রিল মাসে সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের প্রেমের ফাঁদে ফেলার অভিযোগে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা প্রতারণার মামলায় মডেল মেঘনা আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে, ফেসবুকে প্রায় নগ্ন হয়ে লাইভে এসে অপহরণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করতে দেখা যায় তাকে।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, মেঘনা আলম, দেওয়ান সমিরসহ ২-৩ জনের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র, বিভিন্ন সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের কূটনীতিক, প্রতিনিধি ও দেশীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে প্রলুব্ধ করত। তবে, সেই অভিযোগ তিনি আদালতের সামনে কোরআনের শপথ নিয়ে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তার সঙ্গে কোনো পুরুষেরই কখনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি।

রূপালি পর্দার এক মডেল, যাকে নানা সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্ধনগ্ন অবস্থায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, আদালতে নিজেকে বাঁচানোর জন্যই কি মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনের মিথ্যা কসম কেটে নিজেকে সৎ দাবি করেছেন মডেল মেঘনা আলম?

সম্প্রতি, আরেক অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনাকে পবিত্র মক্কায় উমরাহ হজ পালন করতে দেখা যায়। গত ২৬ জুন মক্কা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পবিত্র উমরাহ পালনের একাধিক ছবি প্রকাশ করেন এই অভিনেত্রী। কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিগুলোর সঙ্গে তিনি নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি লেখেন, প্রথমবার পবিত্র কাবা শরিফের দিকে তাকিয়ে তার মুখ থেকে সব শব্দ যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এসময় তিনি মনের ভেতরে থাকা পরম শান্তির অনুভূতি প্রকাশ করে, মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।

তবে, ভিন্ন চিত্র দেখা যায় ভাবনার পবিত্র উমরাহ হজ পালন শেষে দেশে ফেরার পর। দেশে ফেরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অফিসিয়াল পেজে খোলামেলা পোশাক ও অশালীন অঙ্গভঙ্গিতে একাধিক ছবি প্রকাশ করতে দেখা যায়। এরপরই নেটিজেনরা প্রশ্ন তোলে, পবিত্র উমরাহ পালন করে এসে আবারও, অর্ধনগ্ন ছবি পোস্ট করা, এ কেমন রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা? তাহলে কি পবিত্র কাবা শরিফ দেখে তার বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়া ও শান্তির অনুভূতি প্রকাশ, এসব কেবলই ছলনা? নাকি ধর্মের সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের আবেগ, ধর্মপ্রেম ও ইহকালীন প্রেরণা নিয়ে খেলা?

আশনা হাবিব ভাবনার আগে অভিনেত্রী মারিয়া মিমকেও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পবিত্র উমরাহ হজ পালন করতে মক্কা মুকাররমায় মসজিদে হারামের আঙিনায় দেখা যায়। বোরকা ও হিজাব পরিহিত একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে তিনি লেখেন, প্রতিটি মুসলিম যেন এই অনুভূতি লাভ করতে পারে।

কিন্তু, ভাবনার মতো অভিনেত্রী মারিয়া মিমও বিতর্ক থেকে মুক্ত নন। পবিত্র উমরাহ পালন করতে গিয়ে জেদ্দা থেকে কেনা তার পোশাক নিয়েই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বুক উন্মোচন করা পোশাক পরে, তিনি সাংবাদিকদের বলছেন, পোশাকটি তিনি সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে কিনেছেন।

এতে, সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই বলছে, মারিয়া মিমের এসব খোলামেলা পোশাকই প্রমাণ করে যে, তিনি উমরাহ পালন করতে যাননি। কারণ মানুষ হজ বা উমরাহ পালন করে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য এবং সব ধরনের গুনাহ থেকে মুক্তি চাওয়ার জন্য। কিন্তু, সমালোচনা রয়েছে মিম যেন উমরাহ পালন করতে গিয়েছেন রূপালি পর্দায় নতুনভাবে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিতে। অনেকেই আবার, এসব কর্মকাণ্ডকে ধর্ম অবমাননা ও বিদ্রুপ বলে মন্তব্য করেছে।

জানা যায়, অভিনেত্রী মারিয়া মিম উমরাহ পালন করতে গিয়ে সৌদিতে প্রায় ২০ লাখ টাকার কেনাকাটা করেছেন। বিভিন্ন সময় এ নিয়েও সচেতন মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে।

অন্যদিকে, বড় পর্দার অভিনেত্রী মাহিয়া মাহিকে নিয়েও বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২১ সালে মাহিয়া মাহি ও আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের ফোনালাপ ভাইরাল হলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। সেখানে মাহিয়া মাহিকে নিয়ে মুরাদ হাসানকে অশালীন মন্তব্য করতে শোনা যায়।

পরবর্তীতে, মাহিয়া মাহিও উমরাহ পালন করেন। কিন্তু, উমরাহ থেকে ফিরে তিনিও তার ধর্ম ব্যবসার আড়ালে অশ্লীলতার চমক দেখান বলে সমালোচনা রয়েছে।

বাংলা সিনেমার আরেক অভিনেত্রী পূর্ণিমাও উমরাহ হজ পালন করে আবেগঘন অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন। তিনি জানান, পবিত্র কাবা শরিফ দেখে তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না। তার এই বক্তব্য শুনে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো রূপালি জগত ছেড়ে দেবেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার খোলামেলা ছবি ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ বলছে, এটি ধর্মকে ব্যবহার করে ইতিবাচক ইমেজ তৈরির অংশ।

এছাড়াও, বিভিন্ন সময় এসব অভিনেত্রী ও মডেলদের কারণে বিপাকে পড়ে সামাজিক অনুষ্ঠানে থাকা সাধারণ মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক অনুষ্ঠানেও তারা তাদের নগ্ন শরীরের অশ্লীল ঝলক দেখানোর জন্য অসামাজিক পোশাক পরে অংশগ্রহণ করে।

অভিনেত্রী নীলা ইসরাফিলকে নিয়েও অভিযোগের তীর একইদিকে। বিভিন্ন সময়ে, তার অর্ধনগ্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনা রয়েছে। এছাড়া, একই কারণে দেশ বিদেশে তার ঘুরে বেড়ানো নিয়েও, কৌতুহল রয়েছে জনমনে।

সব মিলিয়ে বড় পর্দা বা ছোট পর্দার অনেক অভিনেত্রী ও মডেলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উমরাহ পালন শেষে আবার আগের জীবনযাপনে ফিরে যেতে। ধর্মপ্রাণ বিশ্লেষকদের মতে, এটি ধর্মকে অবমাননা এবং মানুষের আবেগকে ব্যবহার করার এক ধরনের কৌশল। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন থেকেই যায়, রূপালি জগতের এই দ্বিমুখী বাস্তবতা কোথায় গিয়ে থামবে?



banner close
banner close