শনিবার

৭ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩ কার্তিক, ১৪৩৩

পাঠ্যবইয়ের কাগজ কেনায় সিন্ডিকেটের ৫৫ কোটি টাকা লুটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৭

শেয়ার

পাঠ্যবইয়ের কাগজ কেনায় সিন্ডিকেটের ৫৫ কোটি টাকা লুটের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য কাগজ কেনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত মানের কাগজ অনুমোদন না দিয়ে ছাপাখানাগুলোকে সিন্ডিকেটের সরবরাহ করা কাগজ কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে প্রতি টনে অতিরিক্ত ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে ছাপাখানার মালিকদের।

মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিনের অভিযোগ, বিএইচএল পেপার মিলস লিমিটেড থেকে কেনা এনসিটিবির নির্ধারিত মানের কাগজ তাঁর ছাপাখানায় নেওয়ার পরপরই সেখানে এনসিটিবির একটি দল পাঠানো হয়। দলটি কোনো ধরনের যাচাই ছাড়াই কাগজগুলো পাঠ্যবই ছাপানোর অনুপযোগী বলে জানায়। ফলে ট্রাকে করে সেগুলো ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন তিনি। পরে সিন্ডিকেটের মূল হোতার প্রতিষ্ঠানের এজেন্টের কাছ থেকে তুলনামূলক নিম্নমানের কাগজ কিনলে দ্রুত অনুমোদন পান। এ জন্য তাঁকে টনপ্রতি অতিরিক্ত ২২ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

২৫ হাজার টন কাগজে বাড়তি ৫৫ কোটি টাকা

পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গিয়াস উদ্দিন প্রথমে যে কাগজ কিনেছিলেন, তা পরীক্ষা করে সঠিক মান পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে এনসিটিবি সেটি অনুমোদন দেয়নি।

জানা গেছে, সিন্ডিকেটের সরবরাহ করা কাগজের বাজারমূল্য টনপ্রতি ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। অথচ অনেক ছাপাখানাকে তা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। এভাবে এবার প্রায় ২৫ হাজার টন কাগজ কিনতে ছাপাখানাগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অতিরিক্ত প্রায় ৫৫ কোটি টাকা সিন্ডিকেটের সদস্যদের পকেটে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপাতে প্রায় ৮০ হাজার টন কাগজ প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, এবারও পুরো ৮০ হাজার টন কাগজের অনুমোদন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ছাপাখানাগুলোকে জিম্মি করতে চেয়েছিল সিন্ডিকেটটি। তবে কয়েকটি ছাপাখানার মালিক সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ থাকায় তাদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি সিন্ডিকেট।

শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অনুমোদন পায় ৯০০ টন কাগজ

একটি ছাপাখানা মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্রেশ পেপারের ৯০০ টন কাগজ অনুমোদনের আবেদন করেছিল। কাগজের মান ভালো হওয়া সত্ত্বেও তা আটকে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি ছাপাখানার মালিক শিক্ষামন্ত্রীকে জানান। শিক্ষামন্ত্রী এনসিটিবির কর্মকর্তাদের ডেকে নির্দেশ দেন, কাগজের মান ঠিক থাকলে যেন নির্বিঘ্নে অনুমোদন দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই ৯০০ টন কাগজ থেকে অনুমোদন বাণিজ্য করতে পারেনি সিন্ডিকেট।

এ ছাড়া কয়েকটি ছাপাখানা চীন থেকে উচ্চমানের কাগজ আমদানি করে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করছে।

বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে অনুমোদন নেওয়ার চাপ, প্রাণনাশের হুমকি

ছাপা হওয়া ২ লাখ পাঠ্যবইকে কাগজে-কলমে আড়াই লাখ দেখিয়ে অনুমোদন দিতে রাজি না হওয়ায় এনসিটিবির এক ইন্সপেকশন এজেন্টের মালিককে চোখ উপড়ে ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি ছাপাখানার লোকজনের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ইন্সপেকশন এজেন্টের মালিক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ছাপাখানাটির লোকজন তাঁর বাসায় গিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। বিষয়টি তিনি এনসিটিবির একজন সদস্যকে জানিয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ডিসেম্বরে বই পাবে দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী

নতুন বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার প্রচলন থাকলেও এবার তার আগেই বই বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের হাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই তুলে দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২৪ ডিসেম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নতুন বই পাবে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদেরও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে বই দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত দেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি।

এদিকে সরেজমিনে মাতুয়াইলের ১০টি ছাপাখানায় গিয়ে দেখা গেছে, বিরামহীনভাবে চলছে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ। কোথাও বই ছাপানো হচ্ছে, কোথাও চলছে কাটিং, বাঁধাই ও প্যাকেজিং।

এনসিটিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে ছাপার অগ্রগতি ৭২ দশমিক ১৩ শতাংশ।

নজরদারি জোরদার, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য

আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনসিটিবি। কাজের গতি বাড়াতে সংস্থাটি নজরদারি জোরদার করেছে।

এনসিটিবির প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই পরিদর্শনের দায়িত্ব পাওয়া ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সিরাজীম মুনিরের গত বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিকের শতভাগ বই ছাপা শেষ হয়েছে। প্রথম শ্রেণির ৯৮ দশমিক ২২ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণির ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণির ৯৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৯৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ বই ছাপানো শেষ হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ বেলাল হোসাইন গতকাল জানান, ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৯৬ দশমিক ০৭ শতাংশ বই ছাপানো শেষ হয়েছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির ৯২ দশমিক ১৮ শতাংশ, সপ্তম শ্রেণির ৯২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণির ৬৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং নবম-দশম শ্রেণির ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ বই ছাপানো শেষ হয়েছে।

যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই ছাপানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ বেলাল হোসাইন। তাঁর দাবি, এবার পাঠ্যবই ছাপানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো মানের বই পাবে।

এবার কার্যাদেশ ও চুক্তি সম্পন্ন করে মাধ্যমিকের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শুরু হয়েছিল প্রাথমিকের বই ছাপানো শুরুর প্রায় এক মাস পর। এ কারণে প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক স্তরে ছাপার অগ্রগতি কম।

৩২টি প্রেসকে চিঠি, কাজ তদারকিতে ৫৩টি দল

পাঠ্যবই ছাপানোর কাজের গতি ঠিক রাখতে ৩২টি প্রেসকে চিঠি দিয়ে তাগিদ দিয়েছে এনসিটিবি। বইয়ের মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং টিম কাজ করছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু গতকাল জানান, রোডম্যাপ অনুযায়ী বই সরবরাহের কাজ চলছে।